জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে রাজশাহী থেকে সবজি পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে, ব্যবসায়ীরা সংকটে
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাঁচামাল পরিবহন খাতে। রাজশাহীর বিভিন্ন মোকাম ও হাট থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে ট্রাকপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এ ছাড়া দূরবর্তী চট্টগ্রাম ও সিলেটে একই পণ্য পরিবহনে খরচ প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন নতুন সংকটে।
ভাড়া বৃদ্ধির বিস্তারিত তথ্য
রাজশাহীর একাধিক ব্যবসায়ী ও পরিবহন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। আগে যেখানে রাজশাহী থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় যেতে ভাড়া লাগত ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। একইভাবে সিলেট ও চট্টগ্রামে ৩০ থেকে ৩২ হাজারের জায়গায় ভাড়া লাগছে ৪০ হাজার টাকা।
সোমবার পবা উপজেলার নওহাটা বাজারে গিয়ে সবজি ব্যবসায়ী ও পরিবহনের মালিক-চালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই বাজারে ভোর থেকে শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত সবজি কিনেন ব্যবসায়ীরা। এরপর বস্তাবন্দী করা হয় এবং দুপুরের আগে থেকে সবজির বস্তা ট্রাকে তোলা হয়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হতাশ সবজি ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
সবজি ব্যবসায়ী মো. রিপন পটোলে বলেন, "আগে এক বস্তা পণ্য ঢাকায় পাঠাতে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা লাগত, এখন সেটা ২৫০ টাকা পর্যন্ত গিয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় গাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেক জায়গায় পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে বাজারে কাঁচামালের দামও কমে যাচ্ছে এবং কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।"
আরেক ব্যবসায়ী সোহাগ আলী জানান, প্রতি কেজি ঢ্যাঁড়সে এক টাকা করে খরচ বেড়েছে। এক বস্তায় ৮০ কেজি ঢ্যাঁড়স আছে, অর্থাৎ বস্তাপ্রতি ৮০ টাকা খরচ বাড়তি। তিনি বলেন, "এক বস্তা পণ্যে ৭০ থেকে ৮০ টাকা ভাড়া বেড়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই এই পরিবর্তন হয়েছে। খরচ বাড়লেও সব সময় সেই অনুযায়ী আয় বাড়ছে না।"
পরিবহন মালিক ও চালকদের বক্তব্য
ট্রাকমালিক মো. আলী সরদার বলেন, "এত দিন খরচ বাড়াননি। কিন্তু এক লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা বেড়েছে, না বাড়িয়ে উপায় নেই। আগে ঢাকার ভাড়া ছিল ২০-২১ হাজার টাকা, এখন ২৪-২৫ হাজার নিতে হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় আমাদের কিছু করার নেই। একটি ট্রাক ঢাকায় যেতে-আসতে প্রায় ১৫০ লিটার ডিজেল লাগে, এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তেলের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সব জায়গায় ঠিকমতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম তেল দিচ্ছে পাম্পগুলো।
ট্রাকচালক মো. মিঠুন বলেন, "আগে একবার ট্রাকের তেলের ট্যাংকি ভরতে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা লাগত। এখন ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা লাগে। কিন্তু সব সময় ট্যাংকিভর্তি তেলও পাওয়া যায় না। এতে মাঝপথে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।"
বাজারের অবস্থা ও ভবিষ্যৎ আশা
নওহাটা হাটের ইজারাদার আজাদ সরকার জানান, প্রতিদিন এই হাট থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার কাঁচামাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হয়। তেলের সংকটের কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে আশা করা যায়, কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
এদিকে নগরের নওদাপাড়া আমচত্বর এলাকায় একটি পাম্পে তেল নিতে ট্রাকচালকদের লম্বা লাইন দেখা গেছে। ট্রাকচালক সাদিকুর রহমান বলেন, "তেলের দাম যতই বাড়ুক, তেলটা তো সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।" তিনি রাত আটটা থেকে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন এবং দুপুরের দিকে পাম্পের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন।
এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী থেকে সবজি পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি ও তেল সংকট কৃষি ও বাণিজ্য খাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



