জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
জ্বালানির দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। তিনি জাতীয় সংসদে দীর্ঘ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে মডেস্ট পর্যায়ে রয়েছে। সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৭তম দিনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এই বক্তব্য দেওয়া হয়।
সংসদে প্রশ্নোত্তরে মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী তার বিশদ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। রুমিন ফারহানা তার প্রশ্নে উল্লেখ করেন, ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য ও প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি জানতে চান, দীর্ঘদিন ধরে ডাবল ডিজিটে থাকা মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৯ শতাংশের কিছু উপরে রয়েছে বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বিশ্বব্যাপী তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাণিজ্যমন্ত্রী তার জবাবে প্রথমেই বলেন, মূল্যস্ফীতি কেন তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাবে না—এটি বোঝা জরুরি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে, বাংলাদেশে তার তুলনায় মূল্যবৃদ্ধি মডেস্ট পর্যায়ে রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ২ ডলার ৭০ বা ৮০ সেন্ট ছিল, যা বর্তমানে ৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের আশেপাশের দেশ বা তুলনীয় অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গেও তুলনা করে তিনি দেখান যে প্রতিটি দেশেই জ্বালানি পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশ্লেষণ
বাণিজ্যমন্ত্রী সংখ্যাগত উদাহরণ দিয়ে বলেন, ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ১৫ শতাংশ হারে। তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন, শিল্প কারখানায় উৎপাদন খরচের ৭ থেকে ৮ শতাংশ জ্বালানি খরচ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ৭ থেকে ৮ শতাংশকে ১০০ শতাংশ ধরে বিবেচনা করলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ হয়েছে। পরিবহন খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে একটি বাসের প্রায় ২৫-৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এই ৩০ লিটার ডিজেলের দাম বৃদ্ধি হয়েছে ৪৫০ টাকা।
পণ্য পরিবহনে প্রভাব সীমিত
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, যদি ট্রাকে পণ্য পরিবহনের জন্য এই ৩০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হয়, তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে ১০ হাজার কেজি পণ্যের উপরে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুনতে অনেক মনে হলেও পরিবাহিত পণ্যের ইউনিট ভিত্তিতে হিসাব করলে তা মূল্যস্ফীতির জন্য তেমন উদ্দীপক নয়। অর্থনীতির মৌলিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও মডেস্ট নীতি অনুসরণ করেছে এবং খুবই মডারেট হারে মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বয়ংক্রিয় মূল্যবৃদ্ধি প্রক্রিয়া
বাণিজ্যমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরেন যে, বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রিগার হয়। এর জন্য সরকারের আলাদা কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশও এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতা ও সংযমের সঙ্গে জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করেছে। তার মতে, এই নীতির ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।



