বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। রোববার এ দরপত্র ঘোষণার পর ১ জুন থেকে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো পেট্রোবাংলা থেকে সাগর জরিপের ডেটা ও আবেদন ফরম কিনতে পারবে। ফরম জমা দিতে হবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে।
২০২৪ সালে পেট্রোবাংলা একই দরপত্র আহ্বান করেছিল। তখন ৯ মাসে ৬টি বিদেশি কোম্পানি ফরম কিনলেও কেউ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ব্লক নিতে আগ্রহ দেখায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবারের দরপত্রও বিএনপি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন আগ্রহী নয় বড় কোম্পানিগুলো?
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৭টি কোম্পানি দরপত্র কিনেও জমা দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সন মবিল, শেভরন, সিনক, জাপানের একটি কোম্পানি এবং থাইল্যান্ডের পিটিটিও। কেন তারা অংশ নেয়নি তা অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলার এক পরিচালকের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
কমিটির কাছে ওই ৭ আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) জানিয়েছে, মূলত চারটি কারণে তারা আগ্রহী নয়:
- গ্যাসের দাম ও ভাগাভাগি: উৎপাদিত গ্যাসের ভাগাভাগিতে আইওসির অংশ কম ছিল। এবারের উৎপাদন বণ্টনচুক্তিতে (পিএসসি) গ্যাসের দাম ও লভ্যাংশ বাড়ানো হয়েছে।
- বোনাস কমানো: আইওসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লভ্যাংশের ৫ শতাংশ বোনাস বছরে দিতে হতো, যা কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এতে তাদের ঠকানো হচ্ছে।
- ব্লকের আয়তন ছোট: ব্লকগুলোর আয়তন ছোট হওয়ায় বড় বিনিয়োগ সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছে।
- পাইপলাইন পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়: গভীর বা অগভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইন বসানোর পরিকল্পনা ও হুইলিং চার্জ নির্ধারণ করা হয়নি। এবার হুইলিং চার্জ নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধিত পিএসসি ও নতুন সুযোগ
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব জানিয়েছেন, গতবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারের মডেল পিএসসিতে বেশকিছু সংশোধন আনা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এবার ভালো সাড়া মিলবে।
এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সন মবিল আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। দরপত্র ১ জুন উন্মুক্ত হলে চীন, জাপান ও থাইল্যান্ডের কোম্পানিও আগ্রহী হতে পারে, যা ভূরাজনীতির ইস্যুকে সামনে আনবে।
গ্যাস সংকট ও সমুদ্রসীমার সম্ভাবনা
দেশে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়, যার মধ্যে আমদানি করা এলএনজি ১০০ কোটি ঘনফুট। চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। এবার দ্বিতীয়বার গভীর-অগভীর সমুদ্রে ২৬টি ব্লকের দরপত্র দেওয়া হয়েছে। গভীর ১৫টি ও অগভীর ১১টি ব্লক।
গভীর সমুদ্রে ডিএস ব্লক-১১-এর কাছে মিয়ানমার ১৫ বছর আগে 'সোয়ে' ফিল্ডে গ্যাস ব্যবহার করছে। আইনি লড়াইয়ের পর ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মীমাংসা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস আবিষ্কার করলেও বাংলাদেশ এখনো পায়নি। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় এখন পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের অদূরে অগভীর সমুদ্রে 'সাংগু' গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের মোট সমুদ্রসীমা ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল।
চুক্তির শর্তাবলী
সম্প্রতি মডেল পিএসসি অর্থনীতি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন হয়েছে। এতে ২০২৩ সালের পিএসসি থেকে বেশকিছু সংশোধন আনা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠান এককভাবে বা যৌথ উদ্যোগে একাধিক ব্লকের জন্য আবেদন করতে পারবে। ঠিকাদার কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা সম্পূর্ণ দেশে নিতে পারবে। কোনো সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি দিতে হবে না।
গ্যাসের মূল্য ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে ফ্লোর ও সিলিং মূল্য নির্ধারণ করা হবে। গভীর ও অগভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট সাড়ে ৭ থেকে ১১ ডলার হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেছেন, গ্যাস সংকটের সময়ে এটি বড় খবর, তবে চ্যালেঞ্জিংও বটে। অনেকদিন পর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান হবে। বড় গ্যাসক্ষেত্র পেলে দেশের জন্য সুখবর হবে।



