দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ জিডিপি ছাড়াল
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ জিডিপি ছাড়াল

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ সরকারের আর্থিক বোঝা অনেকটা বেড়েছে। কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাস শেষে জনগণ ও বিভিন্ন বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২৭ ট্রিলিয়ন বা ৩১ লাখ ২৭ হাজার কোটি ডলার। অন্যদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত জিডিপি ছিল ৩১ দশমিক ২২ ট্রিলিয়ন ডলার।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এই গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বলেছে, কোভিড মহামারির শুরুর দিকের কিছু সময় বাদ দিলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মাত্র দুই বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ জিডিপির চেয়ে বেশি ছিল। প্রতিষ্ঠানটি মূলত বাজেট–ঘাটতি কমানোর পক্ষে কাজ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয় হু হু করে বেড়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক ঋণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কর কমানো, সুদ পরিশোধে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ। এতে মেডিকেয়ার ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো কর্মসূচির ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশন।

মেডিকেয়ারের চেয়েও বেশি সুদ পরিশোধ

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকায় ফেডারেল সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বেড়েছে। এখন দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা কিংবা মেডিকেয়ারের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থা আমেরিকান লেজিসলেটিভ এক্সচেঞ্জ কাউন্সিলের (এএলইসি) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ জোনাথন উইলিয়ামস বলেন, বর্তমান ঋণের মাত্রা, অতিরিক্ত ব্যয় ও জাতীয় ঋণের কারণে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও সামরিক প্রস্তুতি হুমকির মুখে পড়বে। জাতীয় ঋণের সুদ ব্যয় এখন বছরে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডেট হেল্ড বাই পাবলিকের অর্থ হলো, ফেডারেল সরকারের বাইরে থাকা ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অঙ্গরাজ্য সরকার বা বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে দায়। সরকারের নিজের দায়সহ মোট স্থূল ঋণের পরিমাণ এখন ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই দ্রুত বর্ধনশীল ঋণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক সংকট হবে কি না, নাকি যুক্তরাষ্ট্র তা সামাল দিতে পারবে। যদিও এর স্পষ্ট উত্তর এখনই পাওয়া যাচ্ছে না, কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের মতো সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এ ধরনের সংস্থা সাধারণত আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চায়।

কেন বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ

২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তখন ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন বা ৫ লাখ কোটি ডলার। পিটারসন ফাউন্ডেশনের মতে, মূল সমস্যা হলো আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। অর্থাৎ কর রাজস্ব ও অন্যান্য উৎস থেকে সরকার যত আয় করছে, ব্যয় করছে তার চেয়ে বেশি। ফলে ফেডারেল কর্মসূচি চালাতে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে।

কত দ্রুত বাড়ছে ঋণ

কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ফেডারেল ঋণ বাড়বে। ২০৩৬ সালে ফেডারেল সরকার ব্যবস্থাবহির্ভূত ঋণের পরিমাণ ৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটি ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলেছে, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ জিডিপির প্রায় ১০১ শতাংশ হলেও ২০৩৬ সালে তা বেড়ে ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ফলে ১৯৪৬ সালের আগে ঋণের অনুপাত যে সর্বোচ্চ ১০৬ শতাংশ ছিল, সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, এটি অনিবার্য নয়; নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেট সোমবার প্রস্তাব দিয়েছে, বাজেট–ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত, বর্তমানে যা প্রায় দ্বিগুণ। তাদের মতে, এতে ঋণ-জিডিপির অনুপাত নিম্নমুখী ধারায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আর্থিক নমনীয়তা ও বাজারের আস্থা বজায় থাকবে।

কী ধরনের ঝুঁকি

পিটারসন ফাউন্ডেশনের মতে, ক্রমবর্ধমান ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে আছে সুদ ব্যয় বৃদ্ধি, যে কারণে অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির ব্যয় কমতে পারে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এতে আর্থিক সংকটের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা হারালে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দেশটির ঋণমান কমিয়ে দিতে পারে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের মতে, অতিরিক্ত ঋণ মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যায়। জোনাথন উইলিয়ামস বলেন, ঋণের সীমা যতবারই বাড়ানো হোক, বর্তমান ফেডারেল ঋণ টেকসই নয়। কংগ্রেস দ্রুত আর্থিকভাবে দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণ না করলে সাধারণ মার্কিনদের এর মূল্য দিতে হবে—উচ্চ কর, ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়তে হতে পারে তাদের।

বাজার কী বলছে

অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো শক্তিশালী ও প্রবৃদ্ধিমুখী। ফলে ঋণ বাড়লেও তা আপাতত সামাল দেওয়া সম্ভব। জেপিমরগান চেজের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ কৌশল বিভাগের প্রধান জ্যাকব মানুকিয়ান ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, গত পাঁচ বছরের মধ্যে চার বছরই অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঋণের গড় সুদহারের চেয়ে বেশি ছিল। এই ইতিবাচক ব্যবধান ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে। জ্যাকব আরও বলেন, সুদ পরিশোধের ব্যয় এতটা বেড়ে গেছে যে মুদ্রানীতি অকার্যকর হয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হবে—এমন প্রমাণ নেই। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের চাহিদা এখনো বেশি। এতে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা আপাতত দেশটির আর্থিক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন না। মানুকিয়ানের ভাষায়, বিনিয়োগকারী পরিবার, মিউচুয়াল ফান্ড ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো নতুন ইস্যু করা মার্কিন ঋণপত্র কিনতে আগ্রহী।