বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উদ্বেগ: দুই বছরে অর্ধকোটি মানুষ দারিদ্র্যের বলয়ে
গত নভেম্বরে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। এর আগের বছরও ৩০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ দারিদ্র্যের বলয়ে ঢুকে পড়েছেন।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার প্রভাব
ওই প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কাছাকাছি থেকে নেমে ২০২৫ সালে প্রায় ৪ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে, আয় বাড়ার সুযোগ সংকুচিত হয়, আর নিম্নআয়ের মানুষ প্রথম ধাক্কাটা সামলান—কখনো নীরবে, কখনো ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে।
এর আগে গত এপ্রিলে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করে বলেছিল, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশে চলতি বছর নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ
আমাদের দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির মোটাদাগে তিনটি কারণ আছে। প্রথমত, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে, সেই হারে আয় বাড়েনি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। জাতীয়ভাবে একটি পরিবারের মাসে গড় আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। খরচ হয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। সঞ্চয় নেই বললেই চলে। ক্রয়ক্ষমতার এই অবক্ষয় মানুষকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের সংকট। সংখ্যায় কর্মসংস্থান বাড়লেও মানসম্মত ও স্থায়ী চাকরি বাড়েনি। শিক্ষিত বেকারের হার উদ্বেগজনক—স্নাতকদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ বেকার। মোট বেকার প্রায় ২৬ লাখের বেশি। চাহিদা অনুসারে কর্মসংস্থান হয়নি, বরং কমেছে। ২০১৬ সালের পর শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের অংশীদারত্ব আনুপাতিক হারে বাড়েনি। শুধু সংখ্যা বেড়েছে।
তৃতীয়ত, কোভিড মহামারির পর কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্পমজুরির কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এর মানে, নিম্ন মজুরির কর্মসংস্থান বেশি হয়েছে, যা দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও আপেক্ষিক দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বাড়ছে।
আয়বৈষম্য বৃদ্ধি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট আয়ের প্রায় সাড়ে ২৮ শতাংশ ছিল। একই সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট আয়ের প্রায় ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের হিসাবে এই বৈষম্য অনেক বেশি বেড়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ, আর সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের ভাগে রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
আয়বৈষম্য পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো গিনি সহগ। বাংলাদেশে গিনি সহগ ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১০ সালে এই সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৮২-এ। আর ২০২২ সালের ‘হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে’ অনুযায়ী গিনি সহগ দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯-এ। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রায় উচ্চ বৈষম্যের সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
কৃষির ভূমিকা
সম্প্রতি যেসব উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে, সেসব দেশে কৃষির উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে দ্রুত গতিতে। এই বাস্তবতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো চীন ও ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কৃষির উন্নয়ন দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে জনপ্রতি খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যশস্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
দারিদ্র্য কমানোর উপায়
দারিদ্র্য কমাতে হলে শুধু অর্থসহায়তা নয়; বরং একটি সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। নীতির মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো থাকতে পারে:
- মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দারিদ্র্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
- টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, এবং গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালীকরণ নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, খাদ্যসহায়তা ও নগদ সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা জরুরি। একটি পরিবারের একজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যেতে পারে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নতুন সরকার হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি (২০২৬ সালের) নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচনের মূল লক্ষ্য হিসেবে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে। আশা করা যায়, সরকারে গিয়ে এখন তারা বিষয়গুলো বাস্তবায়নে জোর দেবে। সেই সঙ্গে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে, সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দারিদ্র্য কমানো সম্ভব নয়।
