সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে ২০২৬-২৭ বাজেট জনতুষ্টিমূলক, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
সালেহউদ্দিনের মতে বাজেট জনতুষ্টিমূলক, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

সাবেক অর্থসচিব সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জনতুষ্টিমূলক হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটি প্রথম বাজেট। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সরকারের বাজেট হিসেবে এটি বড় ও সম্প্রসারণমূলক হবে, যা আগেই অনুমান করা যাচ্ছিল। তবে বাজেটের আকার নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই; বরং তিনি একে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।

জনমুখী বাজেটের প্রতিশ্রুতি

সালেহউদ্দিন বলেন, বাজেটটিকে জনমুখী করে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিফলনও এতে রয়েছে। তবে বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বাস্তবায়ন কতটুকু এবং কীভাবে হবে। বাস্তবায়নের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মূল প্রশ্ন হলো, এত অর্থ ও সম্পদ কোথা থেকে আসবে।

বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন

এবারের বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে। বৈদেশিক উৎসের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ এবং ৬ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য অনুদান। সালেহউদ্দিনের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এত ঋণ পাওয়া কঠিন হবে। সহজ শর্তে বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া দিন দিন কমে যাচ্ছে। বৈদেশিক অর্থায়ন কমে গেলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর ভরসা করতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভ্যন্তরীণ উৎসের বড় খাত ব্যাংক খাত, যেখান থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বড় লক্ষ্যমাত্রা। কিন্তু সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রির প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক। ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকলেও অনেক ব্যাংক ৩০-৩৫ শতাংশ টাকা দিয়ে ট্রেজারি বিল কিনে বসে আছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থায়ন সংকট ও বেসরকারি খাত

বাজেট বাস্তবায়নের অর্থায়ন কোথা থেকে হবে? সালেহউদ্দিনের মতে, ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিতে হতে পারে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমিয়ে দেবে। বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রাখা উচিত। অতিপ্রয়োজনীয় ছাড়া অন্য খাতে ব্যয় করার লোভ সংবরণ করতে হবে।

রাজস্ব সংগ্রহ ও সংস্কার

আসল কথা রাজস্ব সংগ্রহের অবস্থা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এবার বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারে এনবিআরে সংস্কার আনার চেষ্টা করা হলেও সফল হয়নি। দেশের রাজস্ব-জিডিপি হার অত্যন্ত কম। বর্তমান প্রবৃদ্ধি দিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। যারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, তাদের ৬০ শতাংশের শূন্য কর। অর্থাৎ বেশির ভাগ লোকের করযোগ্য আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার নিচে, অথচ করযোগ্য আয় আছে এমন মানুষ সমাজে কম নয়। বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে বিতর্ক আছে: সরকার কর চায়, কিন্তু মানুষের বক্তব্য করের বিনিময়ে কী সেবা পাবেন।

নতুনত্ব ও অগ্রাধিকার খাত

এবারের বাজেটে কিছু নতুনত্ব আছে। যেমন অনেক ব্যবসা খাত থেকে অগ্রিম কর (এআইটি) তুলে দেওয়ার প্রস্তাব, যা ভালো সিদ্ধান্ত। ব্যবসায়ের লাইসেন্স বা নিবন্ধন তাড়াতাড়ি দেওয়ার ঘোষণাও আছে। অর্থমন্ত্রীর বিনিয়োগের প্রতি নজর রয়েছে। দেশি বিনিয়োগ না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বিনিয়োগ বাড়লে সবই হবে, তবে সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। মোটাদাগে তা কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাত—এই পাঁচটি করা যেত। অগ্রাধিকার খাতের চিন্তা ইতিবাচক, তবে অগ্রগতি না হলে মানুষ নাখোশ হবে।

বাস্তবায়ন ও দুর্নীতি

বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহের পাশাপাশি দরকার সঠিক বরাদ্দ, কার্যকর তদারকি এবং সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন। দেশে প্রায়ই প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয়, ফলে প্রত্যাশা পূরণ হয় না। সালেহউদ্দিন বিশ্বাস করেন, অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেট ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

দুর্নীতি কীভাবে কমবে? এ ব্যাপারে সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বার্তা দিতে হবে। সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন থাকলে গত দেড় দশকে এত অনিয়ম-দুর্নীতি হতো না। প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করলে দুর্নীতি কমবে। ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো হওয়া উচিত, পাশাপাশি গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি।

আস্থা ও প্রত্যাশা

আগামী বাজেট বড় হয়েছে, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে। তবে সালেহউদ্দিন আস্থা রাখতে চান যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশের আর্থিক খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছর দিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছেন। আমরা তাঁর এবং বাংলাদেশের সাফল্য দেখতে চাই।