জাতীয় সংসদে বাজেট বিতর্ক: সরকারি ও বিরোধী দলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান
জাতীয় সংসদে বাজেট বিতর্ক: সরকার ও বিরোধীর অবস্থান

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনায় সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা এই বাজেটকে জনমুখী, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানবান্ধব বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অপরদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা বাজেটকে ঋণনির্ভর, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিপূর্ণ এবং কাঙ্ক্ষিত সংস্কারবিমুখ বলে সমালোচনা করেছেন।

সরকারি দলের বক্তব্য

রবিবার (১৪ জুন) সম্পূরক বাজেটের ওপর নির্ধারিত সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা মূলত প্রস্তাবিত বাজেট নিয়েই বক্তব্য দেন। এসময় তারা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যাও তুলে ধরেন এবং রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য এম এ মান্নান বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেটে খেটে খাওয়া মানুষ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণদের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।” তিনি একে সমৃদ্ধ বাজেট বলে উল্লেখ করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামীম কায়সার বলেন, “বাজেটকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ হলেও তার কোনও যৌক্তিকতা নেই।” তিনি বলেন, “যারা ছায়া বাজেট দিয়েছে তারা বাস্তবায়নের পদ্ধতি বলেনি।” গাইবান্ধায় স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দীন বলেন, “বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর কথা বলা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে বাজেটকে আরও জনবান্ধব করা সম্ভব হবে।”

খুলনা-৪ আসনের এমপি আজিজুল বারী হেলাল বলেন, “বর্তমান সরকার বিনিয়োগে স্থবিরতা ও দুর্বল ব্যাংকিং খাতের মতো সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য নিয়েই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কর ও শুল্ক হ্রাস এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে একই সঙ্গে তিনি খুলনার রূপসা ও ভৈরব নদী খনন এবং বন্ধ পাটকল চালুর বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবের কথা উল্লেখ করেন। পাটকল বেসরকারিকরণের পরও সেগুলোকে পাটকল হিসেবেই পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি রাশেদা খানম বলেন, “বাজেটে ধনীদের আয়ের মাধ্যমে গরিবের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ৬০টি নিত্যপণ্যে কর কমানো হয়েছে। নারী অধিকার নিশ্চিত করতেও পদক্ষেপ রয়েছে।”

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ সমতলের নৃগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ রাখার বিষয়টি ইতিবাচক উল্লেখ করে তাদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার বিষয়ে বাজেটে নির্দেশনা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে পাঁচজন করে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দেন।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “এবারের বাজেট জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, পরিবেশ, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”

বিরোধী দলের সমালোচনা

অপরদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা করেন।

রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমীন বলেন, “বাজেট বাস্তবায়িত হলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও নেই।” তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগের দাবি জানান।

নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফি বাজেটকে ঋণনির্ভর আখ্যা দিয়ে বলেন, “দেশের মানুষ কর দিতে আগ্রহী হলেও দুর্বল প্রশাসন ও অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে করব্যবস্থা ভীতিকর হয়ে উঠেছে।” তিনি ভ্যাট কমানো, ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপ এবং করনীতি সংস্কারের প্রস্তাব দেন। অতীতের মতো এবারও ঋণনির্ভর ও অপচয়মুখী বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, “সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও বাজেটে তার প্রতিফলন নেই। জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের জন্য নামমাত্র বরাদ্দ রাখা হয়েছে।” তিনি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগও তোলেন।

রাজশাহী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মুজিবুর রহমান বাজেট বিতর্কে অপচয় ও দুর্নীতির বিষয়গুলো পর্যাপ্তভাবে আলোচিত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আরও সংযত ভাষায় রাজনৈতিক মন্তব্য করার আহ্বান জানান।

নীলফামারী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম বলেন, “৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে জেলা পর্যায়ে কত বরাদ্দ যাচ্ছে তা স্পষ্ট নয়।” ভবিষ্যতে জেলা-ভিত্তিক বরাদ্দ স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেই।”

উল্লেখ্য, সোমবার (১৫ জুন) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে।