পর্যটন অর্থনীতি: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
পর্যটন অর্থনীতি: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ এবং এ খাতে ৭৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। তিনি বলেন, 'উপযুক্ত পরিসংখ্যান না থাকলেও এ সংখ্যা ৭৫ লাখের নিচে নয় বলে আমার বিশ্বাস।' পর্যটনকে ঘিরে একটি অর্থনীতি বিদ্যমান, যা 'পর্যটন অর্থনীতি' নামে পরিচিত।

অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় এসে একটি লন্ডভন্ড অর্থনীতি পেয়েছে। লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতি আরও নাজুক হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া, ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ এবং হরমুজ সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে, যা কিছু নগদ অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও অনেক কিছু হারাতে হবে।

বাজেট প্রণয়নে পরামর্শ

আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সরকার ভীষণ অসুবিধায় আছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগামী দুই বছরের আগে অর্থনীতিকে সঠিক জায়গায় আনা সম্ভব নয়। দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ঋণ না নিয়ে স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বাজেটে অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা নিতে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পর্যটন খাতের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিল, যেখানে পর্যটন খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সেই কৌশলপত্র বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে ধারণা করা যায়। লেখকের মতে, 'কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে প্রণীত উক্ত কৌশলপত্র কর্মকর্তাদের ড্রয়ারে বা অফিসের শেলফে অবস্থান নিয়েছে।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের পর্যটন খাত দুর্বল নয়, বরং দুর্বল করে রাখা হয়েছে। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বন—সব কিছুই প্রকৃতি দিয়েছে, কিন্তু সরকারের উদাসীনতায় সেগুলো পর্যটন পণ্যে রূপান্তরিত হয়নি। ডমেস্টিক, ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড—সব ধরনের পর্যটন হচ্ছে, তবে ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের নিম্নমুখী প্রবণতা দৃশ্যমান।

বেসরকারি উদ্যোগ ও হসপিটালিটি

ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইডরা তাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে পর্যটন ব্যবসা এগিয়ে নিচ্ছেন। টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক হাউজবোট, সুন্দরবনগামী বিলাসবহুল লঞ্চ, সেন্ট মার্টিনগামী প্রমোদতরি—এসব বেসরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রির প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে; কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের তারকা হোটেল এবং দেশের আনাচে-কানাচে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট।

ডমেস্টিক এয়ারলাইনস খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য, তবে সবাই ব্যবসাসফল হতে পারেনি। যারা টিকে আছে, তারা ভীষণ ব্যবসাসফল। পর্যাপ্ত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু উদ্যোগ হারিয়ে গেল, তা গবেষণার বিষয়।

সরকারি ও বেসরকারি ভূমিকা

পর্যটন শিল্প থেকে পূর্ণমাত্রায় সুবিধা আদায়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা নির্ধারণ জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা এনবিআর বাজেটপূর্ব সময়ে পর্যটন স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সভা করে উন্নয়নের কৌশল নির্ধারণ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে, যা ধরে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে পারলে শিল্পকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া যাবে।

মার্কেট রিসার্চ ও মার্কেট ডেভেলপমেন্টের ওপর নিরন্তর গবেষণা এখন সময়ের দাবি। পর্যটনের মৌলিক সুবিধা সংবলিত অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারকে বড় পুঁজি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সরকারের সামর্থ্য না থাকলে বিশেষ ছাড় দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।

আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও নীতিসহায়তা

মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও ভারতের দূতাবাস যেমন রোড শোর মাধ্যমে পর্যটনের বাজার সৃষ্টি করছে, তেমনি বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনগুলোর মাধ্যমেও রোড শো করে দেশের পর্যটন শিল্পকে তুলে ধরতে হবে। বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করতে সরকারকে পর্যাপ্ত নীতিসহায়তা দিতে হবে। করের চাপ কমানো এবং সাবরাংয়ের মতো উদ্যোগ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে হবে।

লেখকের মতে, 'যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারলে আগামী দিনে অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প।'