ব্যবসা শুরুতে সময় ৩৫৫ দিন থেকে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা সরকারের
ব্যবসা শুরুতে সময় ৩৫৫ থেকে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা

নতুন কোম্পানি নিবন্ধন থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার পর্যায় পর্যন্ত বর্তমানে যেখানে গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগে, সেটি কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স, আইআরসি, ইআরসিসহ ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অনুমোদন একক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্য

রবিবার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তিনি বলেন, দেশে ও বিদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে একটি কোম্পানি নিবন্ধন থেকে ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, ক্লিয়ারেন্স ও অনুমোদন পেতে গড়ে ৩৫৫ দিন লাগে। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হচ্ছে। ফলে নতুন কোম্পানি গঠন করে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার পর্যায়ে যেতে সর্বোচ্চ ১৪ দিন লাগবে। যেসব অনুমোদনের জন্য সরেজমিন পরিদর্শন প্রয়োজন হবে, সেগুলোও সমন্বিত একটি সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ট্রেড লাইসেন্স

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনে যেতে হবে না। জাতীয় একটি অনলাইন পোর্টালে আবেদন, ফি পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেই ডিজিটালভাবে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া যাবে। স্থানীয় সরকারের প্রাপ্য অর্থও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাবে। পাশাপাশি আরজেএসসি, শেয়ার হস্তান্তর, লিকুইডেশনসহ ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবাও ডিজিটাল করা হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাজেটের মূল দর্শন ও খাতভিত্তিক বরাদ্দ

তিনি বলেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন ‘স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি’। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে এবার মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, যা আগে ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দও ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। অন্যদিকে ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ৩১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমেছে।

অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে বছরে সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৪১ থেকে ৪২ শতাংশে উন্নীত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ও লজিস্টিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগের কথা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মান প্রায় ১০ শতাংশ। এ ব্যবধান কমাতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দ্রুত করা এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি সংকট ও সমাধান

জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে বর্তমানে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ সংকট মোকাবিলায় নতুন একটি এফএসআরইউ যুক্ত করে অতিরিক্ত ৫৫০ থেকে ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সার কারখানার জন্য পৃথক এলএনজি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।

রফতানি বহুমুখীকরণ

রফতানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে চামড়া ও পাট খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, সাভারের ট্যানারিগুলোকে আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজির গোল্ড সনদ অর্জনে সহায়তা দিয়ে চামড়া রফতানিকে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের সহযোগিতায় পাট গবেষণা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাজেটের প্রশংসা করে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, অর্থমন্ত্রী এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করেছেন, যা তার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তার ভাষ্য, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে এটি একটি বাস্তবসম্মত বাজেট।