রপ্তানি আয়ে ধস: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন ডলার, কমল ০.৫৮%
রপ্তানি আয়ে ধস: ৪৮ বিলিয়ন ডলার, কমল ০.৫৮%

দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক রপ্তানি খাত একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার— যা আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। পুরো অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে মাত্র দুই মাস রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, বাকি ১০ মাসই ছিল নিম্নমুখী।

তৈরি পোশাক খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক খাতও এবার নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে পড়েছে। অর্থবছর শেষে এ খাতের রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয় নয়, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও এর চাপ বাড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব এখন কারখানার ভেতরেও স্পষ্ট। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে, উৎপাদন কমিয়েছে, আবার একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হচ্ছেন এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জুনের প্রবৃদ্ধি কি বাস্তব চিত্র?

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধিকে বাজার পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ২০২৫ সালের জুনে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছিল। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি কার্যদিবস থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির বড় অংশই ক্যালেন্ডারজনিত প্রভাব, নতুন ক্রয়াদেশ বৃদ্ধির প্রতিফলন নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের ভাষ্যও একই। তাঁর মতে, জুনের উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।

কেন লোকসানে যাচ্ছে কারখানা?

উদ্যোক্তারা বলছেন, গত একবছরে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে সুতার দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। ডাইং ও কেমিক্যালের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, পরিবহন ও ব্যাংক ঋণের সুদের ব্যয়ও বেড়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হননি। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও রপ্তানি মূল্য প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে।

শিল্প মালিকদের মতে, বর্তমানে অনেক কারখানা শুধু কর্মসংস্থান ধরে রাখার জন্য উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। লাভের পরিবর্তে লোকসান মেনে নিয়েই অর্ডার সম্পন্ন করতে হচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কমছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সীমিত করছে।

একের পর এক কারখানা বন্ধ

এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। ঈদের পর গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘোষণা এসেছে। গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। লিথী গ্রুপের পাঁচটি কারখানাও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।

ইসলাম গার্মেন্টস (ইউনিট-২) শ্রমিক অসন্তোষের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।

কারখানা মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকিং সহায়তার অভাব, পণ্যের বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়া এবং ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারছে না। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী মাসগুলোতে আরও কারখানা বন্ধ হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে।

কেন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ?

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো শুধু কম খরচে উৎপাদন করছে না, বরং উচ্চমূল্যের পণ্য, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।

ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া নতুন নতুন বাজারে প্রবেশ করছে। একই সময়ে বাংলাদেশ এখনও তুলাভিত্তিক পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা।

রপ্তানি খাত কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব নয়। এজন্য একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমানো, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি।

তাদের মতে, কয়েকটি পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন— শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার ও শিল্প মালিকদের যৌথ উদ্যোগ নেওয়া। সিনথেটিক ফাইবার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ানের বাজারে প্রবেশ জোরদার করা। বন্দরের সক্ষমতা, কাস্টমস কার্যক্রম ও লজিস্টিকস আরও আধুনিক করা। শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা। চামড়া, ওষুধ, আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মাণসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে বিশেষ নীতি সহায়তা দেওয়া।

১৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

সরকার আগামী বছরগুলোতে দেশের রপ্তানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে এনেছে। উদ্যোক্তারাও বলছেন, সঠিক নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই লক্ষ্য অসম্ভব নয়।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তার আওতায় আনতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। তবে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি সময়ভিত্তিক জাতীয় রপ্তানি কৌশল।’’

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আস্থা ফিরিয়ে আনা

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু রপ্তানি কমার নয়, এটি শিল্পের সক্ষমতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটও। একদিকে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

তাদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্য রপ্তানি মূল্য নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সহজ অর্থায়ন এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ— এই পাঁচটি বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে রপ্তানি খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায়, সাময়িক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তব সংকট আড়াল করা সম্ভব হলেও শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে।