চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়েছে ৪৪%, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং রেকর্ড
চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়েছে ৪৪%

বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। রাজস্ব আয় ও প্রবৃদ্ধি দুটি ক্ষেত্রেই সাফল্য অর্জন করেছে বন্দরটি। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মাধ্যমেই এই সাফল্য এসেছে।

আয় ও রাজস্ব উদ্বৃত্তে রেকর্ড

২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের আয়, ব্যয় এবং জমাকৃত অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই বছরের ব্যবধানে বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৪৪ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত আয় ছিল ৪ হাজার ৯৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা পরের বছরের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এক বছরে আয় বেড়েছে ২২ শতাংশের বেশি। ব্যয় কমিয়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কর ও ভ্যাট প্রদানের পর মোট রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

গত পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধে কঠোর নীতি অনুসরণের ফলে গত দুই বছর রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি একক অঙ্কে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে তা ছিল ৬.৫০ শতাংশ। তবে ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.১৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৬.১৭ শতাংশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর সরকারি কোষাগারে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর হিসেবে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, ভ্যাট হিসেবে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।

কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং রেকর্ড

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ সত্ত্বেও ২০২৫ সালে সব প্রধান সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত এক বছরে ৩৪ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কন্টেইনারে ৪ শতাংশ এবং কার্গো ও জাহাজের ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস, যা ২০২৪ সালের ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউএস থেকে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউএস বেশি। প্রবৃদ্ধির হার ৪.০৭ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি-রপ্তানি কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন, যা ২০২৪ সালের ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার ১৪ টন থেকে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন বেশি।

জাহাজ হ্যান্ডলিং ও অবকাঠামো উন্নয়ন

২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে, যা ২০২৪ সালের ৩ হাজার ৮৫৭টি থেকে ৪০৬টি বেশি। প্রবৃদ্ধির হার ১০.৫০ শতাংশ। এটি কন্টেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড। এর আগে ২০২০ সালে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭, ২০১৯ সালে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ১৮৭, ২০১৮ সালে ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬ এবং ২০১৭ সালে ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ২২৩ কন্টেইনার পরিবহন করেছিল বন্দরটি।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন ও ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। জাহাজ ব্যবস্থাপনায় উন্নতির ফলে ২০২৫ সালে একাধিক দিন বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান সময় শূন্য ছিল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড, যেখানে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। বাল্ক কার্গোতে এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ শতাংশেরও বেশি।

ডিজিটালাইজেশন ও নিরাপত্তা

বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে অনলাইন ই-মুট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক দিনেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যু করা হয়। ইউএস কোস্ট গার্ডের পরিদর্শনে ইতিবাচক স্বীকৃতি পাওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করেছে।

অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৭০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ ও নতুন হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প ও ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ চলমান। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বন্দর চেয়ারম্যানের বক্তব্য

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, “বন্দরের রেকর্ড সাফল্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী নেতৃত্ব, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানো, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, টার্মিনালের উত্পাদনশীলতার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে পণ্য ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ইয়ার্ড সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে জাহাজজট কমানো সম্ভব হয়েছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ বন্দরের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করেছে।”