এইচএসবিসি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হলো বিইউপির চার বন্ধু
এইচএসবিসি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হলো বিইউপির চার বন্ধু

সময় তিন ঘণ্টা। ব্যবহার করা যাবে না মুঠোফোন, ইন্টারনেট, ল্যাপটপ বা অন্য কোনো ডিভাইস। সামনে থাকবে ব্যবসার কোনো বাস্তবিক পরিস্থিতি নিয়ে ১৫-২০ পাতার একটি বিজনেস কেস। সেটি বিশ্লেষণ করে সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধান খোঁজা এবং বিচারকদের সামনে উপস্থাপন—এই হলো চ্যালেঞ্জ। ‘এইচএসবিসি/এইচকেইউ বিজনেস কেস চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতার প্রতি রাউন্ডে এই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়,’ বলছিলেন মো. রিদওয়ান সাকিব। সম্প্রতি রিদওয়ানদের দল এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছে। জিতেছে ২ হাজার মার্কিন ডলার।

টিম সিক্স সেভেনের পরিচয়

চার বন্ধুর দলটির নাম ‘টিম সিক্স সেভেন’। রিদওয়ান ছাড়া দলের অন্য সদস্যরা হলেন মোহাম্মদ ফাইয়াদ, সাখাওয়াত সেলিম ও নাভিদ আবরার। সবাই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এইচএসবিসির পক্ষ থেকে দলের মেন্টর হিসেবে ছিলেন ইসরাত জাহান।

প্রতিযোগিতার বিবরণ

এইচএসবিসি-এইচকেইউ আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে বলা হয় স্নাতক পর্যায়ে বিশ্বের অন্যতম বড় ‘বিজনেস কেস কম্পিটিশন’। অন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত দলগুলো প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেয়। জাতীয় পর্যায়ের বিজয়ীরাই পরে বৈশ্বিক পর্বে লড়েন। হংকংয়ে এবারের চার দিনের ‘গ্লোবাল রাউন্ড’-এ বিশ্বের ২০টি দেশের মোট ২৪টি দল অংশ নিয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দল গঠন ও নামকরণ

দলের নাম সিক্স সেভেন দলের চার সদস্যের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে। আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। এ বছর সিএফএ ইনস্টিটিউট রিসার্চ চ্যালেঞ্জেও জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয় ফাইয়াদ ও সাখাওয়াতের একটি দল। রিদওয়ান বলছিলেন, ‘দল গঠনটা আমাদের জন্য খুব সহজ ছিল। বন্ধুদের মধ্যে আমরা চারজন খুবই ক্লোজ। ভাবলাম, এটা করা যাক, মজা হবে। আমরা ভাগ্যবান যে বিইউপি আমাদের এক জায়গায় এনেছিল।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত বছর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সিক্স সেভেন’ কথাটি ভাইরাল। অর্থহীন দুটি সংখ্যাই কোনো এক বিচিত্র কারণে জেনারেশন আলফার কাছে ‘মিম ম্যাটেরিয়াল’ বা ‘মজা করার বিষয়’ হয়ে উঠেছে। সেখান থেকেই রিদওয়ানরা দলের নাম ঠিক করেছেন ‘টিম সিক্স সেভেন’। সাখাওয়াত বলছিলেন, ‘খুব ভেবে না, মজা করেই নামটা দেওয়া। আর প্রতিযোগিতার কেসগুলো একটু সিরিয়াস ধরনের হয়। সেটাকেই একটু হালকা করার চেষ্টা বলতে পারেন।’

কাজের ধরন

নিজেদের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করলেন ফাইয়াদ, ‘কেসগুলো একটা ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে। প্রথমে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে করণীয় ঠিক করতে হয়। এটার দায়িত্ব থাকে নাভিদের ওপর। তারপর কৌশল নির্ধারণের কাজটা করে রিদওয়ান। আর্থিক দিকগুলো বিবেচনা করে সাখাওয়াত। সবশেষে বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করতে হয়। সেটা আমার দায়িত্ব।’

তবে এই দায়িত্বগুলো নির্দিষ্ট নয়। সবার মধ্যে আলোচনা করেই সব ঠিক হয়। রিদওয়ান বলছিলেন, ‘দলটা এমনভাবে সাজানো যে আমাদের চারজনের দলকে যদি ১০০ শতাংশ ধরেন, তাহলে এখান থেকে একজনকে হটিয়ে দিলেও ৫০ শতাংশ সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে। এটাকে বন্ধুত্বের শক্তি বলেন আর যা-ই বলেন…’

হংকং অভিজ্ঞতা

হংকংয়ে চার দিন এইচএসবিসির অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে টিম সিক্স সেভেনকে হংকং নিয়ে যাওয়া হয় ১ জুন। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দলগুলোকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। ২-৫ জুন চার ধাপে গ্রুপগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। সব শেষে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয় চারটি দল। তাতে প্রথম হয় অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ইউনিভার্সিটি।

টিম সিক্স সেভেনের সদস্যরা জানালেন, হংকংয়ে চার দিনই প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও ঘোরাঘুরির সুযোগ হয়নি। তার ওপর ফুড পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছিলেন নাভিদ। বলছিলেন, ‘প্রথম রাউন্ড পর্যন্ত আমি ঠিক ছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডের আগে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কিচ্ছু খেতে ভয় পাচ্ছিলাম। এমনও হয়েছে, রাউন্ড শুরুর আগে বমি হচ্ছিল। ওষুধ খেয়ে আবার কাজ করছি। তবে আমার মনে হয়, অসুস্থতা আমার কাজে প্রভাব ফেলতে পারেনি। এটা সম্ভব হয়েছিল আমার টিমের কারণে।’

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সিক্স সেভেনকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি জানতে হয়েছে ভূরাজনীতিও। পড়তে হয়েছে ব্লুমবার্গ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ইকোনমিস্ট-এর মতো পত্রিকা ও সাময়িকী। তবে এসবের সাবস্ক্রিপশন নিতে বেশ খরচ করতে হয়। অন্য দলগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এই সুবিধা পেয়েছে। ফয়সাল বলছিলেন, ‘ব্লুমবার্গ অরিজিনালের ইউটিউব ভিডিও দেখতে হয়েছে বসে বসে। যেটা সপ্তাহে হয়তো তিন-চারটা আসে। সাবস্ক্রিপশন থাকলে প্রতিদিনের আপডেট পেতাম।’

আরেকটা সীমাবদ্ধতার কথা বললেন রিদওয়ান, ‘প্রথম রাউন্ডে যখন দ্বিতীয় হই, তখনই কেস ক্লাবের অভাবটা বুঝতে পারছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো কেস ক্লাব নাই। ওদের প্রতিষ্ঠিত কেস ক্লাব আছে। সেই ক্লাবগুলোতে শেখায়, কীভাবে সমাধান বের করতে হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এটা প্রয়োজন।’