এপস্টাইন কেলেঙ্কারির ছায়ায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন
জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ প্রকাশ পাওয়ার পর দুবাইভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পরিবর্তন করেছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করে।
নতুন চেয়ারম্যান ও সিইও নিয়োগ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন হিজ এক্সিলেন্সি এছা কাজিম। অন্যদিকে, গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন যুবরাজ নারায়ণ। দুবাই মিডিয়া অফিসের মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে এই নিয়োগের কথা জানানো হয়।
বিবৃতি প্রকাশের পরপরই ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের ওয়েবসাইট থেকে সাবেক চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের জীবনী সরিয়ে নেয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর অপারেটর এই প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ছিলেন বিন সুলায়েম।
এপস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ
যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত নথিতে বিন সুলায়েমের নাম ৯,৪০০-এরও বেশি বার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নথিতে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এপস্টাইনের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
যোগাযোগের বিষয়বস্তুতে ছিল ব্যক্তিগত বিষয়, বৈঠক, পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ব্যবসায়িক সুযোগ নিয়ে আলোচনা। এপস্টাইন বিন সুলায়েমকে তার "সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
বিনিয়োগ স্থগিত ও পুনরায় শুরু
এই প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বিআইআই বুধবার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বিনিয়োগ স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানের একজন মুখপাত্র বলেছেন, "এপস্টাইন ফাইলে সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম সম্পর্কে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে আমরা হতবাক। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোম্পানি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া পর্যন্ত আমরা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নতুন কোনো বিনিয়োগ করব না।"
তবে শুক্রবার নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পর বিআইআই-এর একজন মুখপাত্র বলেছেন, "আমরা ডিপি ওয়ার্ল্ডের আজকের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই এবং আমাদের অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।" বিআইআই আফ্রিকার চারটি বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করছে।
কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান লা কেইসও এই সপ্তাহের শুরুতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করেছিল। কিন্তু শুক্রবার বিন সুলায়েমের পরিবর্তনের পর তারা তাদের অংশীদারিত্ব পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দেয়। কানাডিয়ান পেনশন ফান্ড এএফপিকে জানিয়েছে, "কোম্পানি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা দ্রুত ডিপি ওয়ার্ল্ডের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ শুরু করে বিশ্বজুড়ে বন্দর প্রকল্পে আমাদের অংশীদারিত্ব অব্যহত রাখব।"
যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য
প্রকাশিত নথিগুলো থেকে জানা যায়, বিন সুলায়েম এপস্টাইনের বাড়ি ও দ্বীপে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলেন। তিনি এপস্টাইনের সঙ্গে অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্যও শেয়ার করতেন।
একটি দুবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিলেন বিন সুলায়েম। তিনি এপস্টাইনকে বলেছিলেন, "এটাই আমার জীবনের সেরা যৌন অভিজ্ঞতা, আশ্চর্য শরীর"। টোকিও সফরের সময় পাওয়া যৌন ম্যাসেজের কথাও তিনি এপস্টাইনকে জানিয়েছিলেন।
যোগাযোগের রেকর্ডে আরও দেখা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কয়েক বছর আগেই বিন সুলায়েম ইসরায়েল ভ্রমণ করেছিলেন। এপস্টাইন তাকে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি এবং প্রতিনিধি রো খান্না অপ্রকাশিত সংস্করণের নথি পরীক্ষা করার পর এক্স প্ল্যাটফর্মে ২০০৯ সালের একটি ইমেল বিনিময় পোস্ট করেন। সেখানে একটি "নির্যাতনের ভিডিও" নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।
খান্না পরবর্তীতে হাউস ফ্লোরে ছয়জন পুরুষের নাম পাঠ করেন, যাদের নাম তিনি বলেছিলেন লুকানো ছিল। এই তালিকায় বিন সুলায়েমের নামও ছিল। শুক্রবার বিন সুলায়েমের পদত্যাগের পর ম্যাসি এক টুইটে বলেন, "জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এপস্টাইনকে 'নির্যাতন ভিডিও ইমেল' কে পাঠিয়েছিল সেই তথ্য লুকিয়ে রেখেছিল। রিপ্রেজেন্টেটিভ রো খান্না এবং আমি প্রথম তার নাম আবিষ্কার করি এবং সোমবার তা প্রকাশ করি। আজ তিনি পদত্যাগ করেছেন।"
এপস্টাইনের পটভূমি
জেফ্রি এপস্টাইন ২০০৮ সালে একজন নাবালককে যৌনকর্মে প্ররোচিত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ব্যাপক যোগাযোগ বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হয়ে ওঠে।
২০১৯ সালে শিশু পাচারের মামলায় বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় জেলে তার মৃত্যু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
উল্লেখ্য: এপস্টাইন ফাইলে কারো নাম উল্লেখ থাকা নিজেই সেই ব্যক্তির কোনো ভুল কাজের প্রমাণ নয়। ধনী আমিরাতি ব্যবসায়ী বিন সুলায়েমকে এপস্টাইন দুবাই শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের "ডান হাত" হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
