যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাক (আরএমজি) বাজারে আবারও চীনকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য উত্তেজনা, প্রতিশোধমূলক শুল্ক এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনের ফলে চীনের রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ আমেরিকান বাজারে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
ওটেক্সা তথ্য
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল অফিস (ওটেক্সা) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বাংলাদেশ ২.০৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে চীনের রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭০ বিলিয়ন ডলারে।
চীনের রপ্তানি পতন
মাত্র এক বছরে চীনের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৫৩ শতাংশ কমে গেছে। আগের বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের রপ্তানি ছিল ৩.৬১ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে ১.৭০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। শিল্প বিশ্লেষকরা এই পতনের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন: ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধ এবং উচ্চ শুল্ক বাধা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে চীন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যকরণ, এবং চীনের ইউনিট মূল্য ২১ শতাংশ কমলেও রপ্তানি পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের রপ্তানি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপে ৮.৩৮ শতাংশ কমলেও চীনের তুলনায় এই পতন অনেক কম। সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ১১.৬৩ শতাংশ কমে ১৭.৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজার সংকুচিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে, যা দেশের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা প্রতিফলিত করে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বাজার শেয়ার প্রায় ১১.৫ শতাংশ, যেখানে ভিয়েতনাম ২২ শতাংশ নিয়ে শীর্ষ সরবরাহকারী।
এশিয়ার অন্যান্য দেশ
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এশিয়ার প্রধান পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে মিশ্র ফলাফল দেখা গেছে:
- ভিয়েতনাম: ৩.৯৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে, বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও ২.৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
- কম্বোডিয়া: ১৭.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
- ভারত: ২৭ শতাংশ পতনের সম্মুখীন হয়ে রপ্তানি ১.১০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
- ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান: তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতায় ভুগছে, কারখানা চালু রাখতে কম মুনাফার অর্ডার নিতে হচ্ছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞের মতামত
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মোহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বিশ্বব্যাপী পোশাক বাণিজ্য মন্থর থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে চীনের রপ্তানি ব্যাপক হ্রাস আন্তর্জাতিক বাজারে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে, যেখানে বাংলাদেশ শুধু একটি বিকল্প নয় বরং একটি প্রধান সরবরাহকারী হয়ে উঠছে।
সামনের পথ
চীনের হ্রাস পাওয়া বাজার শেয়ার পুরোপুরি কাজে লাগাতে শিল্প বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে মৌলিক পণ্যের বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আরএমজি খাতের ভবিষ্যত নির্ভর করবে বেশ কয়েকটি কৌশলগত পরিবর্তনের ওপর, যেমন:
- উচ্চমূল্যের পণ্য এবং সিন্থেটিক (মানমেড ফাইবার) পোশাকে বিনিয়োগ বাড়ানো,
- বন্দর লজিস্টিকস এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে লিড টাইম উন্নত করা,
- উৎপাদন খরচ বাড়লেও বৈশ্বিক ক্রেতারা কম দাম চাচ্ছে, তাই কারখানাগুলোকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার চীনা উৎপাদন থেকে দূরে সরে যাওয়ায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। লজিস্টিক্যাল ভিত্তি শক্তিশালী করে এবং পণ্যের মিশ্রণ পরিবর্তন করে বাংলাদেশ আমেরিকান পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠতে পারে।



