ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান ব্যর্থ, হকার কার্ডে অনিয়মের অভিযোগ
ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান ব্যর্থ, হকার কার্ডে অনিয়ম

রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গত মাসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং দুই সিটি করপোরেশন— ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পুনর্বাসনের সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই এই কার্যক্রম চলায় উচ্ছেদকৃত হকাররা ফের ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসেছে। এতে নগরীতে তীব্র যানজট ও জনভোগান্তি ফিরে আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে নগরবাসী।

হকার কার্ড নিয়ে বিতর্ক ও আইনি বৈধতা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই সিটি করপোরেশন তড়িঘড়ি করে হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ‘হকার কার্ড’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০০-এর বেশি হকার এই কার্ড নিয়ে পুনরায় ফুটপাতে বসছেন। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া ফুটপাতে বসার বৈধতা দেওয়া নগরজীবনে দীর্ঘমেয়াদী বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।

রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

সরেজমিনে দেখা যায়, গুলিস্তানসহ রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উচ্ছেদ করা হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ হিসেবে গুলিস্তানের রমনা ভবনসংলগ্ন লিংক রোড এলাকায় সাদা দাগ কেটে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এসব নির্ধারিত স্থানে হকাররা ‘হকার কার্ড’-এর মাধ্যমে বসার অনুমতি পাচ্ছেন। নগরবাসীর অভিযোগ, এই উচ্ছেদ অভিযান ছিল কেবল ফুটপাতের ‘নিয়ন্ত্রণ’ পরিবর্তনের একটি সাজানো নাটক। আগে ফুটপাত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে থাকলেও এখন তা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অভিযোগ উঠেছে— বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল বা শ্রমিকদলের নেতাদের সুপারিশ ছাড়া ‘হকার কার্ড’ মিলছে না। এই কার্ড পেতে হকারদের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে এবং দৈনিক ২০০ টাকা হারে চাঁদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলিস্তানে বসার জন্য ‘হকার কার্ড’ পাওয়া এক হকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সিস্টেম আগেরটাই। টেহা ছাড়া দুনিয়ায় কিছু চলে না। তয় টেহা পয়সা লাগলেও এখন একটা সুবিধা হইছে, আমরা এখন বৈধ হকার। পুলিশ তো আগে চাইলেই খেদাইয়া দিতে পারতো বা দোকান ভাঙচুর করতে পারতো— অহন আর পারবো না।” ‘হকার কার্ড’ প্রত্যাশী সবুজ নামের এক হকার জানান, অলরেডি ১২০০ হকারের লিস্ট করে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের বলছে— সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নাকি তাদের নিজেদের লোক। টাকা ছাড়া কার্ড হবে না। আমদের-তো ব্যবসা করে খাওয়া লাগবে। পরিবার চালানো লাগবে। আগেও টাকা দেওয়া লাগতো— তাই এখন আবার দিলাম।”

প্রশাসকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও বিশেষজ্ঞ মত

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম এবং উত্তরের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান— উভয়েই বিএনপির শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক। এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা উচ্ছেদ অভিযানের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক, নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, “সঠিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ সফল হয় না। হকারদের জীবিকা এবং নিম্নবিত্তের অধিকারের কথা মাথায় রেখে নীতিমালা করতে হবে। হুট করে সড়কে বা ফুটপাতে বসার অনুমতি দেওয়া অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, এতে নগরীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।”

ভোগান্তিতে নগরবাসী, সরকারকে দিচ্ছেন দুয়োধ্বনি

উচ্ছেদের পর সাময়িক স্বস্তি মিললেও বর্তমানে গুলিস্তান, মতিঝিল ও মিরপুরের চিত্র আগের মতোই। পুনরায় সড়ক ও ফুটপাতে হকারদের পুনর্বাসনের এই নিয়মকে ‘সাজানো নাটক’ ও ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলার সঙ্গে তুলনা করছেন নগরবাসী। সিটি করপোরেশনের এমন কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে সরকারকে দুয়োধ্বনি দিচ্ছেন তারা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন বলেন, “উচ্ছেদের পর গুলিস্তানে যানজট উধাও হয়েছিল, আমরা বাহবা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন হকার কার্ডের নামে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। আজ যদি টাকার বিনিময়ে হকার বসার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের সরানো কঠিন হবে।” তিনি বলেন, “জীবিকার তাগিদে যেহেতু হকাররা রাস্তায় বা ফুটপাতে ব্যবসা করছেন— সেহেতু তাদের সঠিক নিয়মে কোনও একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা হোক, সড়ক বা ফুটপাতে না।”

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আজমল হোসেনের মতে, সরকার বদলালেও ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার বিষয়টি কেবলই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলায় পরিণত হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু ফুটপাত কখনোই দখলমুক্ত হয় না। সবাই শুরুতে উচ্ছেদের নাটক চালায়। পরে আবার সমঝোতায় চলে যায়।” দক্ষিণ সিটির বংশালের বাসিন্দা সুরাইয়া বেগমের মতে, “সিটি করপোরেশনের নিয়তেই ঘাপলা আছে। তারা কেউই নগরবাসীর ভোগান্তি লাঘব করতে চায় না। জনগণের ভোগান্তিকে পুঁজি করে তারা সবসময় ক্ষমতায় থাকতে চায়।”

‘হকার কার্ডেই’ সমাধান খুঁজছে দুই সিটি করপোরেশন

এদিকে ‘হকার কার্ডেই’ সমাধান খুঁজছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জানান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে এবং পথচারীদের জন্য ৫-৬ ফুট জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় হকার ব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হবে।” পুনর্বাসনের পর সরকার ও সিটি করপোরেশনের বিধিবিধান মেনে এবং বরাদ্দ জায়গায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে বৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি হকারদের প্রতি আহ্বান জানান।

অপরদিকে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, তালিকাভুক্ত ৮২৯ জন হকারের মধ্যে ২০২ জনকে ইতোমধ্যে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পর্যায়ক্রমে বিকল্প স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজারসংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে।