বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক সভায় বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টি চেয়েছে ব্যাংকগুলো। শর্ত দেওয়া হয়েছে, ঋণ খেলাপি হলে যাতে ব্যাংকগুলোর ক্ষতি না হয়, সেজন্য এই নিশ্চয়তা প্রয়োজন। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এই সভায় ব্যাংকগুলোর প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) ও প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তারা (সিবিও) অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ।
সরকারের উদ্যোগ ও ব্যাংকের মতামত
কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে সম্প্রতি সরকার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তহবিল গঠন ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অংশীজনদের মতামত নিতে এই সভার আয়োজন করা হয়। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও শর্ত তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, শিগগির তহবিল ও নীতিমালা ঘোষণা করা হবে। আগামীকাল সোমবারের মধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
ব্যাংকারদের প্রধান দাবি
ব্যাংকারদের অন্যতম দাবি হলো ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা। বন্ধ কারখানা সচল করতে দেওয়া ঋণ আবার খেলাপি হলে যাতে ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিরাপত্তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি জামানত নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারখানাগুলোর সঠিক পরিচালনা ও ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার তদারক করতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরামর্শক বসানোর সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়।
সভায় জানানো হয়, যারা অর্থ পাচার করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের এই সুযোগ দেওয়া হবে না। শুধু নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা তহবিল থেকে সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালায় কী ধরনের শর্ত যুক্ত করলে খাতটির জন্য ভালো হবে, তা জানতে চায়। পাশাপাশি স্পষ্ট করে বলা হয়, যারা কোম্পানি বন্ধ করে অর্থ পাচার করে বিদেশে পালিয়েছেন, তাদের জন্য এই সুযোগ নয়।
স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ রাখা হবে। সম্প্রতি বন্ধ হওয়া কারখানার জন্য স্বল্পমেয়াদি, দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বন্ধ ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কারখানার জন্য মধ্যমেয়াদি, এবং যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়া কারখানার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হবে, যা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হতে পারে।
ব্যাংকারদের উদ্বেগ
ব্যাংকাররা জানান, নীতি-সহায়তার আওতায় ৩০০ গ্রুপের এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান চালু হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরতে পারে। তবে বন্ধ কারখানায় অর্থায়নে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে, কারণ এসব কারখানার খেলাপি ঋণের বিপরীতে মামলা চলমান।
এক ব্যাংকের প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের খেলাপিরা টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। তাদের বিষয়ে কী হবে?’ ডেপুটি গভর্নর বলেন, এর সমাধান নেই।
ডেপুটি গভর্নর আরও বলেন, একটি ভালো গ্রুপকে সব ব্যাংক মিলে অর্থায়ন করে এখন ঝামেলায় পড়েছে। অর্থায়নের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কেউ আসেনি।
পূর্ব অভিজ্ঞতা
ব্যাংকাররা উল্লেখ করেন, করোনাভাইরাসের সময় উদ্যোক্তাদের জন্য ২৩টি আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, যার মোট অর্থ ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। এসব ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপি। তাই বন্ধ কারখানায় নতুন অর্থায়নে কেউ ঝুঁকি নিতে চাইছে না। গ্যারান্টি সুবিধা চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, ঝুঁকি ব্যাংকগুলোকেই নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত শুক্রবার মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিক দলের সমাবেশে ঘোষণা দেন, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত ও বন্ধ কলকারখানা চালুর মাধ্যমে অর্থনীতি শক্তিশালী করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও যোগদানের পর বন্ধ কারখানা চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।



