শহর এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা: অংশীজনদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ
ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত 'শহর এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা: অংশীজনদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা শহর এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবার নানা সংকট ও সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে অংশ নেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের দৃষ্টিভঙ্গি
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) মর্জিয়া হক বলেন, মাঠপর্যায়ের কাজের গতি নষ্ট হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের স্টোর বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত করে দেওয়া এবং মেডিক্যাল অফিসারদের ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ায় মূল কাজ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে ৫০ শতাংশের বেশি পদ খালি থাকায় মাঠকর্মীদের সপ্তাহে দুদিন কমিউনিটি ক্লিনিকে কাজ করতে হয়, ফলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পরিবার পরিকল্পনাকে সাধারণ কম্পোনেন্ট হিসেবে দেখা হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ গুরুত্ব না দিলে আগামী পাঁচ বছরে জনসংখ্যা কয়েক কোটি বেড়ে যেতে পারে। শহর এলাকায় একজন কর্মীকে ১৫০০-২০০০ দম্পতি সামলাতে হচ্ছে, ফলে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি শহরের ১৯০টি সেন্টার কার্যকর করা, সমন্বিত প্রশিক্ষণ ও শহর স্বাস্থ্যসেবা সরাসরি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার ওপর জোর দেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগে. জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, শহর এলাকায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও জনগোষ্ঠী রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ বস্তি রয়েছে, অন্যদিকে গুলশান-বনানীর মতো উচ্চবিত্ত এলাকায় প্রবেশাধিকার নেই। এনজিওগুলো পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলেও তাদের জবাবদিহি সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। তারা সরাসরি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে রিপোর্ট দেয়, ফলে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। তিনি বলেন, এনজিওগুলোর কাজ বিচ্ছিন্ন ও সমান্তরালভাবে চলছে। একই এলাকায় একই ধরনের কাজ অনেকে করছে। এগুলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। সিটি করপোরেশনকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, শহরের হাসপাতালগুলোয় অনেক কিশোরী গর্ভবতী অবস্থায় আসে। বাল্যবিবাহের কারণে তারা স্বাভাবিক প্রসব করতে পারে না, সিজারিয়ান সেকশন প্রয়োজন হয়। ছাড়পত্র নেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা দেওয়া যায় না। সচেতনতার অভাবে তারা বাজার থেকে এমএম কিট কিনে ব্যবহার করে এবং পরে ইনকমপ্লিট অ্যাবরশন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা তীব্র রক্তশূন্যতায় শকে চলে যায়। তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ওপর জোর দেন এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পক্ষে মত দেন। সচেতনতা বাড়াতে বস্তিতে সন্ধ্যাকালীন কাউন্সেলিং, 'উঠান বৈঠক' ও ইমামদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া জরুরি স্বাস্থ্য ফান্ড গঠন ও সেবাকে বেসরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত করার কথা বলেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, চট্টগ্রাম সিটির নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো রয়েছে। চারটি মাতৃসদন হাসপাতাল, ৫০টি ওয়ার্ডে আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সিস্টেম ও ৩৩৫টি ইপিআই সেন্টার রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ নাগরিককে সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাবে পরিবার পরিকল্পনাকর্মীদের ইপিআই কার্যক্রমে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি অনুষঙ্গের ওপর জোর দেন। তিনি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. ইমাম হোসেন বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি ইস্যু। চট্টগ্রাম সিটিতে ১৩২ জন চিকিৎসক ও মোট ১ হাজার ২১৪ জন জনবল রয়েছে। লজিস্টিক সাপোর্ট, প্রশিক্ষণ ও জরাজীর্ণ স্থাপনা সংস্কার প্রয়োজন। ইপিআই কার্যক্রমে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনার কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ভর্তুকি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাজেদা ফাউন্ডেশন
সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদা ফিজ্জা কবির বলেন, শহর এলাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভাব প্রকট। ফাউন্ডেশন জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির 'দ্য চ্যালেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ (টিসিআই)' বাংলাদেশে শুরু করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনা শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির সঙ্গেও জড়িত। পুরোনো সফল মাঠকর্মীদের পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। একটি 'হেলথ ইমারজেন্সি প্রটোকল' জরুরি, যাতে লজিস্টিকস, ফান্ডিং ও ইমপ্লিমেন্টেশনের রূপরেখা থাকবে। দুর্নীতির ভয়ে কেনাকাটা বন্ধ রাখা ঠিক নয়। তিনি বলেন, নতুন করে শেখার কিছু নেই, স্থবির ইঞ্জিনটি আবার চালু করতে হবে।
চিফ অব পার্টি ইমরানুল হক বলেন, শহরের ভেতরে দারিদ্র্য, অভিবাসন ও বস্তির নিম্নবিত্ত মানুষ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। গত ৩০ বছরের অগ্রগতি ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিধাবিভক্ত কাঠামোর কারণে সেবা মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না। জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর স্টকআউট ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বড় ধাক্কা। নতুন সুপারিশের প্রয়োজন নেই, বরং বিদ্যমান সুপারিশ বাস্তবায়ন জরুরি। সিটি করপোরেশন ও মিউনিসিপ্যালিটিগুলোকে নেতৃত্ব নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, পরিবার পরিকল্পনা খাতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। শহর এলাকায় জলবায়ু উদ্বাস্তু অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। কৌশলে কর্মক্ষম নারীদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন সামান্য। আন্তর্জাতিকভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে 'থ্রি জিরো' অর্জনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান অবস্থায় তা প্রায় অসম্ভব। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া বা নাইজেরিয়ার মতো 'পপুলেশন কমিশন' গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনাকে জন্মনিয়ন্ত্রণ হিসেবে না দেখে সামগ্রিক কল্যাণের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বাজেট বরাদ্দে বৈষম্য দূর করতে হবে। আন্তর্জাতিক ডোনারদের ফান্ডিং কমে আসায় নিজস্ব তহবিল গঠনের দিকে নজর দিতে হবে। গবেষক ও শিক্ষাবিদদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ইউএনএফপিএ
ইউএনএফপিএ-র প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট (নগর স্বাস্থ্য) আজমল হোসেন বলেন, শহরের কর্মজীবী নারীদের জন্য 'বিকল্প সার্ভিস ডেলিভারি মেকানিজম' বা 'বিকল্প শিফট' তৈরির কথা ভাবতে হবে। ইউএনএফপিএ ও আইপাস বাংলাদেশ ঢাকা দক্ষিণ, উত্তর ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে সরাসরি গর্ভনিরোধক সামগ্রী নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ফার্মেসিগুলোতে নারী ফার্মাসিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনাকে শুধু 'গরিব মানুষের পদ্ধতি' বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়। উঁচু ভবনে বসবাসকারীদের কথাও ভাবতে হবে। ২০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে আছি। প্রসব-পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা (পিপিএফপি) একটি বিশাল সুযোগ। বেসরকারি খাতে ৮৫ শতাংশ সি সেকশন হচ্ছে, সেখানে পিপিএফপির ওপর নজর দেওয়া উচিত। পরিবার পরিকল্পনাকে জীবন রক্ষাকারী হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে হবে, যা ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সক্ষম।
আইপাস বাংলাদেশ
আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সাইদ রুবায়েত বলেন, গাইডলাইন থাকলেও বর্তমানে দেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সরকারিভাবে বছরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ দম্পতিকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা ছিল, কিন্তু গত দুই বছরে তা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, অতীতের জন্য আক্ষেপ না করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার উপকরণের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত সবার হাত-পা বাঁধা। জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ও খরচ বিবেচনায় সরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির গুরুত্ব বেশি। তিনি সতর্ক করে বলেন, সেবায় ঘাটতি হলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়বে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মাতৃমৃত্যু রোধ করছিল। সেবার পরিধি অর্ধেক হলে বছরে প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ জন মায়ের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু লাখে ৭০-এ নামিয়ে আনার এসডিজি প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ইউনিট
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান (পরিকল্পনা ইউনিট) মো. আবুল কাশেম বলেন, গ্রামীণ এলাকায় সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো ও জনবল থাকলেও শহর এলাকায় ঘাটতি রয়েছে। তবে নতুন পরিবার পরিকল্পনা নীতিমালা, কৌশলপত্র ও দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষ কৌশল তৈরি করা হয়েছে। শহর এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা একদমই অনুপস্থিত। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় সাত কোটি মানুষ বসবাস করে। সরকার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি ৯ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা ১৯০টি ভবনকে নগরস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারী মৈত্রী
নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি বলেন, বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সংকট চলছে এবং সেবার মান নিচের দিকে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো জরুরি। আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে চালাতে গিয়ে উপকরণের অভাব বড় বাধা। আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও সরকার সহযোগিতা করত, এখন নিজস্বভাবে পরিচালনা করতে হচ্ছে। কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো চ্যালেঞ্জ। প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম কেবল হাতে গোনা কিশোর-কিশোরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি ক্লিনিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। সচেতনতার অভাব কেবল নিম্নবিত্তদের মধ্যে নয়, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও রয়েছে।
এসএমসি
এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দীন খান বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী সরবরাহে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশে বর্তমানে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ব্যবহারের ৬০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে, যার মধ্যে এসএমসি প্রায় ৯০ শতাংশ জোগান নিশ্চিত করছে। তবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের উদ্যোগ জোরালো না হলে কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। শহরে সেবার সুযোগ থাকলেও গ্রামীণ এলাকার মতো সুসংগঠিত কাঠামো নেই। মানুষ কেবল হাতের কাছের ফার্মেসি থেকে গর্ভনিরোধক সামগ্রী কিনছে। সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে শহর অঞ্চলেও গ্রামীণ এলাকার মতো সুসংগঠিত পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি চালু করা যায়।
সিডা
সিডার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জহিরুল ইসলাম বলেন, আগে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু এখন নিজস্ব তহবিলের ওপর জোর দিতে হবে। সরকারের ভেতরে কাঠামোগত অস্পষ্টতা দ্রুত নিরসন করা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে একীভূত করার সংস্কারের ভাবনা রয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনাকে একীভূত করার মডেল নিয়ে স্পষ্টতা নেই। নগরায়ণের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। বস্তিকেন্দ্রিক নগরায়ণে নিরাপত্তাহীনতার কারণে দ্রুত বিয়ে হচ্ছে, যা প্রজনন হার বাড়াচ্ছে। শহর এলাকায় কার কী ভূমিকা হবে, তা দ্রুত নির্ধারণ জরুরি। দক্ষ ও স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং 'সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ' মডেলে এগোনো সময়ের দাবি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগরস্বাস্থ্য প্রকল্প
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগরস্বাস্থ্য প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সাদিয়া আফরোজ বলেন, শহর এলাকায় মাঠপর্যায়ে কাজ হচ্ছে, কিন্তু উচ্চ জনঘনত্ব ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইপিআই, পরিবার পরিকল্পনা ও কিশোর-কিশোরীদের সেবার জন্য কাউন্সিলর রয়েছেন। প্রসব-পরবর্তী ও গর্ভপাত-পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবায় আইপাসের সঙ্গে কাজ করে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে, কিন্তু তা স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতিনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। তিনি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা ও স্থায়ী নীতিমালা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান।
হিস্প বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন
হিস্প বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান খান বলেন, শহর এলাকায় স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো টেকসই না হওয়া। প্রকল্প শেষ হলেই নগরস্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে। আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার শুরু থেকেই ভোক্তাকেন্দ্রিক ও স্বল্প ব্যয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালানোর লক্ষ্য ছিল। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর শহরে পরিবার পরিকল্পনা সেবায় তীব্র পতন ঘটেছে। প্রতি তিন মাসে প্রায় ১ লাখ সেবা দেওয়া হতো, তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এডিবি বা সরকারি তহবিল বন্ধ হওয়ার পর সেবা প্রায় ৬০ শতাংশে স্থির আছে। তিনি সুপারিশ করেন: মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি সেবা পুনরুজ্জীবিত করা, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রকল্পনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তহবিল বাড়ানো, স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে পরিবার পরিকল্পনার জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং সিটি করপোরেশনকে নেতৃত্ব দিয়ে সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা।



