যশোর শহরে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির নতুন এক কৌশল দেখা দিয়েছে। মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো দুষ্কৃতকারীরা প্রেমিক-প্রেমিকা বা কাপলদের টার্গেট করে ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদ অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন এলাকায় এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
কলেজশিক্ষার্থীর ওপর হামলা
গত ২ জুন রাত ৮টার দিকে যশোর শহরের ব্যস্ততম মুজিব সড়কের পঙ্গু হাসপাতালের সামনে একটি ঘটনা ঘটে। কলেজশিক্ষার্থী সানি ও তার বান্ধবী রিকশাযোগে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে একটি পালসার মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক তাদের গতিরোধ করে। তারা রিকশা থেকে সানিকে নামিয়ে কৈফিয়ত তলব করে, কেন তারা ঘাড়ের ওপর হাত দিয়ে যাচ্ছে। এরপর তার সঙ্গে কী সম্পর্ক, তা জানতে চেয়ে মোবাইল ফোন বের করতে বলে এবং বাসায় ফোন করে অভিভাবককে আসতে বলে।
অন্যদিকে, সানির বান্ধবীকে অপরজন একপাশে নিয়ে কাছে কত টাকা আছে, মোবাইল ফোন ইত্যাদি দিয়ে দিতে বলে। সানির কাছে চাকু থাকায় ভয়ে ভয়ে সে তার ওয়ালেটে থাকা এক হাজার টাকা দিয়ে দেয়। কিন্তু নাছোড়বান্দা ছিনতাইকারীরা তার বিকাশে থাকা টাকার অঙ্ক এবং ব্যাংকের ডেবিট কার্ড নিয়ে পাসওয়ার্ড বলতে বলে। সানি জানান, বিকাশ কিংবা কার্ডে কোনো টাকা নেই। একপর্যায়ে হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা কিছু টাকাও দিতে বাধ্য হয়। শেষে ছিনতাইকারীরা তাকে পরামর্শ দেয় যে, এভাবে রাস্তাঘাটে মেয়ে বন্ধু নিয়ে যেন আর না ঘোরে।
সাংস্কৃতিক কর্মীর অভিজ্ঞতা
শহরের বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক কর্মী শর্মিষ্ঠা টুপা জানান, ৪ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি হাঁটতে বের হন। ফেরার পথে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে পোস্ট অফিসপাড়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেন একটি সাদা প্রাইভেটকার তার পিছু পিছু আসছে, থামছে আবার চলছে। দ্রুত হেঁটে তিনি ভোলাট্যাংক রোডে পৌঁছতেই গাড়িটাও দাঁড়ায়। আবার হেঁটে তাদের গলিতে ঢুকে বাসায় কলিংবেল চাপতেই স্বামী নামেন। ওদিকে গাড়ি থেকে একজন লোক নামে চোখে কালো চশমা ও মুখে মাস্ক পরা। স্বামীকে বিষয়টি বলার পর দেখেন গাড়িটি সরে গেছে।
শিক্ষকের ওপর চার্জ
শুধু এই দুইজন নন, যশোর টিচার ট্রেনিং কলেজের একজন শিক্ষক শহরতলীর শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীকে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন রিকশায়। রেল রোড থেকে একটি মোটরসাইকেল তাদের ফলো করতে করতে চাঁচড়া পর্যন্ত যায়। ওই শিক্ষক স্ত্রীকে বাসায় রেখে ফিরে আসার সময় মোটরসাইকেলে থাকা দুই যুবক তাকে চার্জ করে।
অভিযুক্তদের তৎপরতা
যশোর শহরের পৌরপার্ক, কালেক্টরেট চত্বর, চিত্রামোড়, রেলগেট, আরবপুর মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলে দুই থেকে তিন যুবক এসব অপকর্মে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে প্রেমিক-প্রেমিকা বা কাপলদের টার্গেট করে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ায়, একটু ফাঁকা স্থানে কিংবা রিকশা চলাচলরতদের টার্গেট করে। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায় এবং সুযোগ বুঝে অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেয়।
ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত
সম্প্রতি রেলগেট তেঁতুলতলা এলাকায় দিনদুপুরে দুষ্কৃতকারীরা মাহফুজুর রহমান (৪০) নামে এক ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে তার কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ টাকা এবং স্বর্ণালংকার লুটে নেয়। পরে তিনি নিজেই হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন এবং থানা পুলিশ না করেই চলে যান।
এসির ক্যাবল চুরির হিড়িক
শুধু নতুন স্টাইলে ছিনতাই নয়, যশোর ও শহরতলীতে এসির ক্যাবল চুরির হিড়িক পড়েছে। এসির তামার তার বা পাইপ চুরি প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। চলতি সপ্তাহে শহরের ষষ্টীতলাপাড়া এলাকায় অনুপ কুমার, বিশাখা রাণীসহ বেশ কয়েকজনের বাড়ি থেকে এসির ক্যাবল চুরি হয়েছে। একটি এসির ক্যাবল চুরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ হয় তা ঠিক করতে।
আইনজীবীর মন্তব্য
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী ফরিদুল ইসলাম বলেন, একটি অপরাধীচক্র বর্তমানে খুবই তৎপর। শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্বামী-স্ত্রী বা যেকোনো পরিচয়ের নারী-পুরুষকে হঠাৎ করে ২-৩ জন ঘিরে ধরে নাজেহাল করে অবৈধভাবে টাকা দাবি এবং হুমকি দেয় যে, টাকা না দিলে মিথ্যা সম্পর্কের বয়ান দিয়ে অপপ্রচার করবে। এই চক্রটি ইতোপূর্বেও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হওয়ায় তারা পুলিশ প্রশাসনের ভয়ে কিছুদিন চুপ ছিল। বর্তমানে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় তারা আবার সক্রিয় হয়েছে। তাদের দৌরাত্ম্যে নারী-পুরুষ শহরে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছে না।
রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের জেলা সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, মানুষের জানমাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের বিকল্প নেই; কিন্তু নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে, এমন পুলিশ প্রশাসন নাগরিকরা পায়নি। এমনকি ফ্যাসিস্টের পতনের পরও পুলিশের সেই ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জ্বালাও-পোড়াও, মব সন্ত্রাস, মাজার ভাঙচুর বিশেষ করে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য দখলবাজদের যে নৈরাজ্য তা দমনে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা দেশবাসী দেখতে পায়নি। এখন উপযুক্ত সময় পুলিশকে তার আপন গতিতে চলার।
পুলিশের বক্তব্য
নয়া স্টাইলে ছিনতাই ও চুরির বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান বলেন, আমি শুনেছি ছিনতাইয়ের এই নতুন সিকোয়েন্স সম্পর্কে। ক্ষতিগ্রস্তরা থানায় অভিযোগ দিলে আমরা অ্যাকশনে যেতে পারি। এসির ক্যাবল চুরির বিষয়ে তিনি বলেন, মাঝে আমরা চক্রের বেশ কয়েকজনকে ধরে জেলে পাঠিয়েছি। আবার নতুন করে হলে ক্ষতিগ্রস্তরা যেন থানায় অবহিত করেন। তাহলে অন্তত আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত ও আটক করতে পারি।



