বাংলাদেশে বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান
বাংলাদেশে বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান

বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, নীতিগত ঘোষণা কিংবা সংস্কারের প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। কাগজে-কলমে আমরা বহুদিন ধরেই একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্যের গল্প শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবতার পরীক্ষায় বারবার সামনে আসে এক ভিন্ন চিত্র—কাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা এখনো বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহকে সীমিত করে রেখেছে।

সরকারি পর্যায়ে আলোচনা

সম্প্রতি টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল টেলিকম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও তিনি তুলনামূলকভাবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, তবু ইতিবাচক দিক হলো—তিনি ধারণাটিকে পুরোপুরি নাকচ করেননি।

একইভাবে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রীকে যখন আমি স্মরণ করিয়ে দিলাম যে ভারতের মতো বৃহৎ দেশেও এখন আর ঐতিহ্যগত অর্থে কোনো ‘জাতীয় এয়ারলাইনস’ নেই, তখন তিনিও বিষয়টির বাস্তবতা স্বীকার করেন। ভবিষ্যতে উপযুক্ত সময়ে কোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দেন। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও উৎসাহিত হয়েছিলেন যখন শুনলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী চা–শিল্পেও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এফডিআই: আস্থার প্রতিফলন

এ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে—বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ শুধু মূলধনের প্রবাহ নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বৈশ্বিক আস্থার প্রতিফলন। বিনিয়োগকারীরা এফডিআইয়ের মাধ্যমে মূলত একটি দেশের শাসনব্যবস্থা, নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নিজেদের আস্থা প্রকাশ করেন। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়াই স্বাভাবিক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক এ অঞ্চলে শুধু সম্ভাবনার গল্প আর যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করবে না। সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য হলো, গত এক দশকে বাংলাদেশ তার বিনিয়োগ পরিবেশে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। ২০১৩ সালের পর থেকে অসংখ্য নীতিগত আলোচনা, বিনিয়োগ সম্মেলন এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আমরা আকর্ষণীয় পরিকল্পনা করেছি, উন্নয়নের রূপরেখা প্রকাশ করেছি, আন্তর্জাতিক মহলে আশাবাদের বার্তা দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গাটিই থেকে গেছে সবচেয়ে দুর্বল।

সংকটের মূল কারণ

এখানেই বাংলাদেশের প্রকৃত সংকট। কারণ, বিনিয়োগকারীরা শুধু প্রণোদনা দেখেন না; তাঁরা খোঁজেন স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং আস্থার পরিবেশ। তাঁরা নিশ্চিত হতে চান যে নীতিমালা হঠাৎ বদলে যাবে না, চুক্তির সম্মান রক্ষা হবে, বৈদেশিক মুদ্রা সহজলভ্য থাকবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসাকে ব্যাহত করবে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ঘটেছে ঠিক উল্টো চিত্র। ২০২১ সালের পর থেকে টাকার উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়ন, দীর্ঘস্থায়ী বৈদেশিক মুদ্রাসংকট, আমদানি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনিশ্চয়তা প্রায়ই ব্যয়ের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। যখন কোনো বিনিয়োগকারী উৎপাদন খরচ, মুনাফা প্রত্যাবাসন বা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারেন না, তখন তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা

রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক খাতে শ্রম অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ এবং ২০২৩-২৪ সময়কালের বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তারা শুধু আর্থিক হিসাব-নিকাশই বিবেচনা করেন না; তাঁরা পরিচালনাগত ধারাবাহিকতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও সমান গুরুত্ব দেন। শক্তিশালী সুশাসন ও সুস্থ শিল্প সম্পর্ক ছাড়া বাংলাদেশ তার ‘স্থিতিশীল উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখতে পারবে না।

সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র

অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ঘর থেকে নেমে ৪ শতাংশের কাছাকাছি এসেছে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ধীরগতির প্রবৃদ্ধি বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করে, আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

তবে এটিকে কেবল পতনের গল্প বললে ভুল হবে। ২০২৫ সালে কিছু ইতিবাচক লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণে নতুন গতি এসেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ হয়তো ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু শুধু পুনরুদ্ধার যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের সংস্কার’।

প্রয়োজনীয় সংস্কার

প্রথমত, সংস্কারকে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে নিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা এখন আর নতুন বক্তৃতা বা নীতিগত ঘোষণা শুনতে চান না; তাঁরা দেখতে চান কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে বাস্তব অর্থেই কার্যকর করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়কে কাগজের বাইরে বাস্তব কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। স্বচ্ছতাকে শুধু বক্তব্যে নয়, প্রশাসনিক আচরণেও প্রতিফলিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নীতিমালার নকশার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ প্রায়ই এই বিষয়টিকে অবমূল্যায়ন করে। অথচ কার্যকর সংস্কারের জন্য দরকার দক্ষ প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত সময়সীমা, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং জবাবদিহি। এগুলো ছাড়া সবচেয়ে উন্নত বিনিয়োগ নীতিমালাও শেষ পর্যন্ত অলংকারস্বরূপ নথিতে পরিণত হয়।

তৃতীয়ত, এফডিআই নীতিকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শুধু মূলধন আকর্ষণ করাই লক্ষ্য হতে পারে না। বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে এমন খাত বেছে নিতে হবে, যেগুলো প্রযুক্তি স্থানান্তর, সরবরাহ চেইনের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। ভিয়েতনাম কেবল প্রণোদনা দিয়েই সফল হয়নি; তারা একটি শক্তিশালী শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে।

সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা

বাংলাদেশের এখনো বহু ভালো দিক রয়েছে—বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি এবং রপ্তানিতে প্রমাণিত সক্ষমতা। কিন্তু ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক এ অঞ্চলে শুধু সম্ভাবনার গল্প আর যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করবে না।

মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান।