উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। তারা বলেছেন, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে কাঠামোগত সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব নীতি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন করতে হবে।
ডিসিসিআই সেমিনারে উদ্বেগ
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই): ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করে ডিসিসিআই।
সেমিনারে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, বিনিয়োগে মন্থরতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা ও তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিফলন দিতে পারছে না। এ বাস্তবতায় ডিসিসিআই ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই)’ চালু করেছে, যা নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।”
গবেষণার ফলাফল
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ড. একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ও সেবা খাতের মোট ৭৬২ জন প্রতিনিধির মতামত নেওয়া হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষিখাতে খাদ্য উৎপাদন কমছে। জ্বালানি সংকটে শিল্পখাতের উৎপাদনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় সেবাখাতও চাপে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, এসএমই খাতে সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় হয়রানি কমাতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত
সেমিনারে অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও পিআরআই’র চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, “গবেষণাটি বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও সারাদেশে সম্প্রসারণ করা গেলে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। একইসঙ্গে এ ধরনের সূচক উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ মূল্যায়নে সহায়তা করবে।”
সাপোর্ট টু সাসটেইন্যাবল প্রজেক্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, “এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসএমই খাত। তাই ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
সরকারের পদক্ষেপ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, “বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবণতা এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা। সরকার ব্যবসা সহজীকরণে আমদানি নীতিমালা যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তা চূড়ান্ত হতে পারে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়নে বাংলাদেশ এখনও ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অথচ, বড় শিল্প অর্থায়নে পুঁজিবাজারের সক্ষমতা ও ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বৈদেশিক বিনিয়োগের কোনও বিকল্প নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।”



