রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও ১১ নম্বর এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ হয়ে শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা রোববার দুপুরে বালতি ও বোতল নিয়ে মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন মূল সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় ২০ মিনিট অবরোধের পর ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে রাতের মধ্যে পানি দেওয়ার আশ্বাস পেয়ে তারা সড়ক ছেড়ে দেন।
সংকটের কারণ ও প্রভাব
এই সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের কারণ রয়েছে। মেট্রোরেল চালুর পর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও আশপাশে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ বেড়েছে, বাড়ছে ভাড়াটে ও স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা। ফলে পানির চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহব্যবস্থা বাড়েনি। এর মধ্যে সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি মিরপুর এলাকায় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ২০ জুন শোধনাগারের ট্রান্সফরমার ও জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেয়। ওই দিন মাত্র ৭ কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়। পরের দুই দিন প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার করে পানি সরবরাহ করা হয়। ফলে তিন দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় মোট ৯ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হয়েছে।
বাসিন্দাদের বর্ণনা ও অভিযোগ
শেওড়াপাড়ার ইকবাল রোডের বাসিন্দা সৈয়দ সারদিন আহমেদ বলেন, "আমাদের এলাকায় দিন–রাত ২৪ ঘণ্টাই পানি থাকছে না। বিভিন্নভাবে পানি সংগ্রহ করে চলতে হচ্ছে। গোসল করতে আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে সংকট বেশি।"
মনিপুর এলাকার এক বাসিন্দা, যিনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি বড় পদে কর্মরত এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তিনি বলেন, "পানি যে জীবনে কতটা অপরিহার্য, সংকটে না পড়লে তা বোঝা যায় না।"
চার দিন ধরে মিরপুর ১১ নম্বরের কিছু এলাকাতেও পানির সংকট চলছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, কখন পানি আসবে, কতক্ষণ থাকবে কিংবা সংকট কত দিন চলবে—এসব বিষয়ে ওয়াসার কাছ থেকে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আগে থেকে পানি সংরক্ষণ বা দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না।
ওয়াসার ব্যাখ্যা ও উদ্যোগ
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, "এপ্রিল, মে ও জুন পানির জন্য সংকটকাল। এ সময় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। মিরপুরের বিভিন্ন পাম্প থেকে যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, তার এক-তৃতীয়াংশের কম পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো পাম্প থেকে সক্ষমতার পাঁচ ভাগের এক ভাগ পানি উঠছে।" তিনি আরও জানান, ভাকুর্তা থেকে একসময় দিনে ১৫ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি পাওয়া গেলেও সম্প্রতি তা ১২ থেকে ১৩ কোটি লিটারে নেমে আসে। এর মধ্যে জেনারেটর অকেজো হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
ওয়াসার এমডি আরও বলেন, বিভিন্ন স্থানে অনুমতি ছাড়া মূল পাইপ কেটে পানির সংযোগ নেওয়া হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজের সময়ও পানির লাইনের ওপর চাপ পড়েছে। সংকট সামাল দিতে এখন রেশনিং করে একেক এলাকায় একেক সময়ে পানি দেওয়া হচ্ছে। নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুরোনো নলকূপ প্রতিস্থাপনের কাজও চলছে। পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "বেলা দুইটার দিকে শতাধিক মানুষ পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছিলেন। ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে কথা বলার পর পানি দেওয়ার আশ্বাস পেয়ে তাঁরা চলে যান।"
বিস্তৃত প্রেক্ষাপট
ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এই চাহিদা পূরণে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নদীর পানি শোধন করেও সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম হচ্ছে।



