বাংলাদেশে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং: ৬৫% ক্রসিংয়েই নেই নিরাপত্তা, ৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়েও থামছে না প্রাণহানি
অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং: ৬৫% ক্রসিংয়েই নেই নিরাপত্তা, থামছে না প্রাণহানি

দেশের রেলপথে লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩,২৮৬টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ২,১৪৪টি (৬৫ শতাংশ) সম্পূর্ণ অরক্ষিত, যেখানে কোনো গেটম্যান বা প্রতিবন্ধক নেই। গত ঈদুল ফিতরের দিন কুমিল্লায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা এই দুর্বলতার সাম্প্রতিক নিদর্শন।

দুর্ঘটনার ধরণ ও কারণ

কুমিল্লার দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই সময় দায়িত্বে থাকার কথা ছিল গেটম্যান মো. মেহেদী হাসান ও মো. হেলাল উদ্দিনের। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে তাঁরা টাকার বিনিময়ে নাজমুল হোসেন ও কাউসার হোসেনের সঙ্গে দায়িত্ব বদল করে বাড়ি চলে যান। পরে বদলি গেটম্যান দুজন ঘুমিয়ে পড়লে ট্রেন আসার সময় গেট ব্যারিয়ার না ফেলায় বাসটি রেলপথে চলে আসে। এর আগে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট কক্সবাজারের ভারুয়াখালীতে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে কক্সবাজার এক্সপ্রেসের বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে শিশুসহ চারজন নিহত হন। গত বছরের ৫ জুন চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুর লেভেল ক্রসিংয়েও একাধিক যানবাহনের সংঘর্ষে দুজন মারা যান।

প্রকল্পের ব্যর্থতা

লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়নে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে ২০১৫ সালে দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্প দুটির কাজ শেষ হয়েছে এবং পূর্বাঞ্চলে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭৪ কোটি টাকা, পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা, মোট ব্যয় ৩৩৪ কোটি টাকা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লেভেল ক্রসিং নিরাপদ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এর আলোকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।' প্রকল্পের অধীনে গেটম্যান নিয়োগ, গুমটিঘর নির্মাণ, সড়ক মেরামত ও প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও গেটম্যানের ভুল ও অরক্ষিত ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা থামছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অরক্ষিত ক্রসিংয়ের বাস্তবতা

দেশে ৩,৪২৮ কিলোমিটার রেলপথে প্রতি ৯৫০ মিটারে একটি করে ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ২,১৪৪টি (৬৫ শতাংশ) অরক্ষিত, যার বড় অংশই অনুমোদনহীন। স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তায় তৈরি এসব অবৈধ ক্রসিংয়ের দায়িত্ব নিতে রাজি নয় রেল কর্তৃপক্ষ। অরক্ষিত ক্রসিংয়ে শুধু 'সাবধান, এই গেটে কোনো গেটম্যান নেই' লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, কোথাও তা-ও নেই। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ১৫৪টি ক্রসিং স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থার আওতায়, ৩৫৯টিতে ফোনে বার্তা দেওয়া হয় এবং ৬৩৯টিতে গেটম্যান শব্দ বা সময় অনুযায়ী প্রতিবন্ধক ফেলেন। বাকি ক্রসিংগুলো পুরোপুরি অরক্ষিত।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক পদ্ধতি

আন্তর্জাতিকভাবে লেভেল ক্রসিং নিরাপদ করতে দুটি পদ্ধতি স্বীকৃত: ট্র্যাক সার্কিট ব্যবস্থা (প্রতি ক্রসিংয়ে ৩০-৪৫ লাখ টাকা ব্যয়) এবং এক্সেল কাউন্টার (প্রতি ক্রসিংয়ে ১ কোটি টাকার বেশি)। উভয় পদ্ধতিতেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, নতুন রেডিও ওয়ার্নিং ব্যবস্থা পরীক্ষামূলক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতি ক্রসিংয়ে সাড়ে ১২ লাখ টাকা খরচ হবে। সারা দেশে এ ব্যবস্থা চালু করতে প্রয়োজন ৪০০ কোটি টাকার বেশি। প্রতিটি ইঞ্জিনে যন্ত্র বসাতে আরও ৮ লাখ টাকা করে খরচ হবে, সব ট্রেনে বসাতে ২০ কোটি টাকা।

বুয়েটের প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি প্রস্তাবে রেডিও ওয়ার্নিং ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যা জিপিএস ও সৌরবিদ্যুৎ চালিত হবে। অধ্যাপক হাদীউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, 'বুয়েট যে ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশীয় অভিজ্ঞতার মিশেল। প্রযুক্তি ও উপকরণ স্থানীয়। খরচও কম হবে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।' ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থার সঙ্গে অটোমেটিক ট্রেন প্রটেকশন যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে, যা নাশকতার ক্ষেত্রে চালককে সতর্ক করবে। এ ছাড়া ক্রসিংয়ে ট্রেন আসার সময় কাউন্টডাউন প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুমিল্লার দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বুয়েটের প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।