এনসিসি ব্যাংক ১৯৮৫ সালে ন্যাশনাল ক্রেডিট লিমিটেড (এনসিএল) নামে মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৩ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ছিল—শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখা। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এম শামসুল আরেফিনের মতে, বর্তমানে ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম ও অবস্থান বিবেচনায় বলা যায় দীর্ঘ মেয়াদে সেই লক্ষ্য সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য অর্জন
শুরুর দিকে ব্যাংকটি মূলত এসএমই ও মাঝারি করপোরেট খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কভিত্তিক গ্রাহক গোষ্ঠী গড়ে তোলে। এরপর গত ৭–৮ বছরে কৌশলগত রূপান্তরে বড় করপোরেট, রপ্তানি খাতে অগ্রাধিকারসহ বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ বাড়ায়। ব্যাংকের গত তিন দশকের কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘টপ টেন সাসটেইনেবল ব্যাংক’-এর তালিকায় স্থান পাওয়া। যা সুশাসন, দায়িত্বশীল ব্যাংকিং ও সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কার্যক্রমের স্বীকৃতি। সব মিলিয়ে এনসিসি ব্যাংক শুধু প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যই পূরণ করেনি, বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত, আধুনিক ও টেকসই করেছে।
আস্থার সংকটে স্থিতিশীল অবস্থান
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থাজনিত সংকট দেখা গেলেও এনসিসি ব্যাংক স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, শৃঙ্খলা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এ সময়ে। শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও, কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবার প্রতিনিয়ত মানোন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ আধুনিক সেবা নিশ্চিত করে গ্রাহক আস্থা বজায় রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ের কারণে সংকটেও এনসিসি ব্যাংক স্থিতিশীল ছিল।
ঋণ ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকার
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, ইমপোর্ট কস্ট ও সুদহার বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি মন্থর। এ অবস্থায় এনসিসি ব্যাংক ‘ঝুঁকিসচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ’ কৌশল নিয়েছে। এনসিসি ব্যাংক নির্বাচিত উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বজায় রেখে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ও তারল্য নিশ্চিত করছে—এই ভারসাম্যই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে টেকসই অবস্থানে রেখেছে।
আমানত প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গত কয়েক বছরে আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। গ্রাহকদের আস্থা, সেবার মানের ক্রমবর্ধমান উন্নতি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রসারের ফলে সব ধরনের আমানতই বেড়েছে। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আওতায়ও নতুন আমানত সংগ্রহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন ‘এনসিসি অলওয়েজ’ ও ‘সঞ্চয়ী অ্যাপ’-এর মাধ্যমে নিয়মিত সঞ্চয় হিসাব খোলার প্রবণতা বাড়ছে। আমানত কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, স্বল্প ব্যয়বহুল তহবিল (চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব) এবং উচ্চ ব্যয়বহুল তহবিল (স্থায়ী ও স্কিমভিত্তিক আমানত)-এর মিশ্রণ বর্তমানে প্রত্যাশিত পর্যায়েই রয়েছে। বর্তমান কৌশল অনুযায়ী, এনসিসি ব্যাংক ‘চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব’ভিত্তিক আমানত বাড়ানোর ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আমরা তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এগুলো হলো—ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায় থেকে আমানত বাড়ানো, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও সম্প্রসারিত করা ও স্থায়ী আমানতের ভিত্তি শক্তিশালী করা।
ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন
এনসিসি ব্যাংক ডিজিটালাইজেশনের ধারায় দ্রুত আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যাংকে রূপ নিচ্ছে। ব্যাংকিংয়ে এখন শাখানির্ভর সেবার বদলে সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে প্রযুক্তিই মূল চালিকা শক্তি। আমাদের ব্যাংকের দুটি প্রধান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—‘এনসিসি আইকন’ (করপোরেট গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যাংকিং) ও ‘এনসিসি অলওয়েজ’ (রিটেইল গ্রাহকদের জন্য অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং)। এ ছাড়া ই-কেওয়াইসি, সেলফ সার্ভিস পোর্টাল ও কিউআর পেমেন্টে শাখানির্ভরতা কমেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্তমানে আমাদের ‘এনসিসি-নেক্সট’ (পেপার ও ক্যাশলেস সেভিংস অ্যাকাউন্ট) রয়েছে। আগামী দিনে আমাদের এআইভিত্তিক পার্সোনালাইজড ব্যাংকিং, বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস, আরও অত্যাধুনিক সাইবার সিকিউরিটি, ভার্চ্যুয়াল কার্ড, ডিজিটাল ঋণ ও ফিনটেক ইন্টিগ্রেশনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে এজেন্ট ও ডিজিটাল-ফার্স্ট মডেলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো হবে।
গত বছরের অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এনসিসি ব্যাংকের গত বছর ছিল ঝুঁকিসচেতন সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল অগ্রগতির। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কিছু দুর্বল ব্যাংকের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে সৃষ্ট একটা সংকটের মধ্যেও আমাদের আমানতে (রিটেইল, করপোরেট, ইসলামিক) প্রবৃদ্ধি ও তারল্য স্থিতিশীল অবস্থা বজায় ছিল। ঋণে এসএমই-কৃষি-রপ্তানিমুখী খাতে অর্থায়ন বেড়েছে, পাশাপাশি ঋণের সতর্ক ব্যবস্থাপনা ও উদ্বৃত্ত তহবিল ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে আয়ের ভিত্তি শক্ত করেছে। ডিজিটাল লেনদেন ও নন-ফান্ডেড আয়ে উন্নতি, আর ক্রেডিট মনিটরিং ও আর্লি ওয়ার্নিং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও মজবুত করেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—একটি স্মার্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবস্থান মজবুত করা।



