ঢাকা ওয়াসার ‘শান্তি’ পানি উৎপাদনে প্রতিটি আধা লিটারের বোতলে খরচ হচ্ছে প্রায় ১১ টাকা, কিন্তু তা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে মাত্র ৯ টাকায়। ফলে বোতলপ্রতি ২ টাকা লোকসান গুনছে সরকারি এই সংস্থাটি। অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর একই আকারের বোতল দোকানিরা ১১ টাকায় কিনে ২০ টাকায় বিক্রি করে ৯ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন, যা শান্তি পানির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। তাই দোকানের তাকে জায়গা পাচ্ছে বেসরকারি ব্র্যান্ড, আর শান্তি পানি পড়ে আছে কারখানা ও ওয়াসার কয়েকটি বিক্রয়কেন্দ্রে।
দুই দশকে ১৫ কোটি টাকা লোকসান
মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই কারখানা চালুর দুই দশক হতে চলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, এ সময়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাদ দিয়েই বছরে লোকসান হচ্ছে দুই থেকে তিন কোটি টাকা। মাসভেদে পানি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকার। অথচ প্ল্যান্টটি প্রতি ঘণ্টায় ১০ হাজার লিটার পানি শোধন এবং ৬ হাজার লিটার বোতলজাত করতে সক্ষম। বর্তমানে মাসে প্রায় আট লাখ লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে, যা পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
উদ্দেশ্য সফল হয়নি, লাভও আসেনি
ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বোতলজাত পানির দাম ইচ্ছেমতো বাড়াতে না পারে এবং মানুষ যেন কম দামে নিরাপদ পানি পায়—এই লক্ষ্য নিয়ে শান্তি পানি উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বাজারে পণ্যটি সহজলভ্য না হওয়ায় বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দামের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি। কম দামে সাধারণ মানুষের কাছে পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। উল্টো বছরের পর বছর উৎপাদন, পরিবহন, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করছে ঢাকা ওয়াসা।
উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শান্তি পানির বোতল তৈরিতে অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এক টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। তবে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো গেলে বোতলপ্রতি খরচ কিছুটা কমবে। এ জন্য আগামী ছয় মাসের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরের ছয় মাসে তা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’ শান্তি পানিকে লাভজনক করতে একটি কারিগরি কমিটি ও একটি বিপণন কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে প্ল্যান্টটি লাভজনক করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে ওয়াসা।
বাজারজাতকরণের ব্যর্থতা
শান্তি পানির সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজারজাতকরণ। রাজধানীতে বোতলজাত পানির প্রধান বিক্রয়স্থল মুদিদোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ও সুপারশপ। কিন্তু এসব জায়গায় শান্তি পানি সচরাচর দেখা যায় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গাড়ি প্রতিদিন নির্ধারিত পথে দোকানে দোকানে পানি পৌঁছে দেয়। কোনো দোকানে মজুত শেষ হলে বিক্রয় প্রতিনিধিকে ফোন করেও নতুন চালান পাওয়া যায়। শান্তির ক্ষেত্রে এমন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এর পরিবেশক ও বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যাও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে ডিলার বা গ্রাহককে প্ল্যান্ট কিংবা ওয়াসার বিক্রয়কেন্দ্র থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। খুচরা ব্যবসায়ীর কম লাভও শান্তি পানি বিক্রির পথে বড় বাধা। একই জায়গা ব্যবহার করে বেসরকারি কোম্পানির পানি বিক্রিতে দ্বিগুণের বেশি লাভ হলে দোকানিরা স্বাভাবিকভাবেই সেই পণ্য রাখতে বেশি আগ্রহী হন।
আবার প্রচারেও পিছিয়ে রয়েছে শান্তি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন, দোকানের সাইনবোর্ড, ফ্রিজ, ছাতা ও বিভিন্ন প্রচারসামগ্রীর মাধ্যমে নিজেদের পণ্য ক্রেতাদের সামনে রাখে। শান্তি পানির ক্ষেত্রে ওয়াসার এমন কোনো দৃশ্যমান প্রচার নেই। ফলে দুই দশক আগে বাজারে এলেও বহু মানুষ এখনো জানেন না, ঢাকা ওয়াসা বোতলজাত পানি উৎপাদন করে। ওয়াসা দীর্ঘদিন শান্তিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবেও বাজারজাত করেনি। উৎপাদিত পানির একটি অংশ সরকারি দপ্তর, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সভা, অনুষ্ঠান ও বিশেষ প্রয়োজনে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যেসব জায়গা থেকে পানি কেনেন, সেখানে পণ্যটি পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা
ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্ল্যান্টটি পরিচালনার জন্য কোনো কর্মকর্তাকে পূর্ণকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তাদের মূল কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্ল্যান্টের কাজ দেওয়া হতো। ফলে উৎপাদন কম হলে, বিক্রি না বাড়লে বা লোকসান হলে কার কাছে জবাব চাওয়া হবে, সেই কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সম্প্রতি একজন কর্মকর্তাকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন ও বিক্রি বাড়িয়ে প্ল্যান্টটিকে লাভজনক করার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। তবে প্ল্যান্ট চালুর সময়ই যে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, বিপণন পরিকল্পনা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, তা করতে প্রায় দুই দশক লেগে যাওয়াকে ওয়াসার বড় ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
লাভে ফেরাতে যা করতে হবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমেই স্বাধীনভাবে প্ল্যান্টের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে। পানি শোধন, বোতল, ছিপি, লেবেল, বিদ্যুৎ, জনবল, পরিবহন, যন্ত্র মেরামত ও নষ্ট হওয়া পণ্যের খরচ আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে। এরপর এমন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ওয়াসা লোকসান না করে এবং খুচরা ব্যবসায়ীরাও পণ্যটি বিক্রি করতে আগ্রহী হন। প্ল্যান্টটিকে ওয়াসার সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে না চালিয়ে আলাদা বাণিজ্যিক ইউনিট করা যেতে পারে। এর প্রধানকে উৎপাদন, বিক্রি, বাজার সম্প্রসারণ ও লোকসান কমানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্য দিতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত পরিবেশক নিয়োগ করে নির্ধারিত পথে নিয়মিত দোকানে পানি পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও সরকারি অনুষ্ঠানে স্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে শান্তি পানি সরবরাহ করা যেতে পারে। অনলাইনে অর্ডার নেওয়া, বাড়িতে জার পৌঁছে দেওয়া এবং বড় ক্রেতাদের জন্য আলাদা সরবরাহব্যবস্থা চালু করলেও বিক্রি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মাসে কত পানি উৎপাদিত ও বিক্রি হলো, কত টাকা আয় ও ব্যয় হলো এবং কোন প্রতিষ্ঠান বোতল, কাঁচামাল ও পরিবহনসেবা দিচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। সামাজিক কারণে কম দামে পানি বিক্রি করা হলে ভর্তুকির পরিমাণও আলাদাভাবে হিসাব দেখাতে হবে।
নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনগণের টাকায় গড়া একটি প্ল্যান্ট উৎপাদন করেও যদি মানুষের কাছে পানি পৌঁছাতে না পারে এবং বছরের পর বছর লোকসান দেয়, তাহলে সেটি স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। স্বচ্ছ হিসাব, পেশাদার বিপণন ও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা ছাড়া শান্তি পানি লাভজনক হবে না। এ জন্য ওয়াসাকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’



