দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালককে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের পর ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন—প্রশাসক দিয়ে কতদিন চলবে ইসলামী ব্যাংক? কারণ এটি কোনো ছোট বা দুর্বল ব্যাংক নয়। প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত, দেশের বৃহত্তম রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক এবং শিল্প খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন ভাঙা হলো পুরো পর্ষদ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ৪৭(৩) ধারার ক্ষমতাবলে আমানতকারী, ব্যাংক এবং জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক একের পর এক সংকটের মুখে পড়ে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, গ্রাহকদের বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা, সংসদে আলোচনা এবং বড় অঙ্কের আমানত উত্তোলনের ফলে ব্যাংকটির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ সহায়তা হিসেবে আড়াই হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সংকটের মূল কারণ অর্থের ঘাটতি নয়; বরং আস্থার ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নরের ভাষায়, “ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের চেয়েও ভয়ংকর হলো আস্থা সংকট। একবার গ্রাহক ভয় পেয়ে গেলে অর্থ দিয়ে সেই সংকট দ্রুত সমাধান করা যায় না।”
প্রশাসকের দায়িত্ব কী?
মোহাম্মদ জহির হোসেন এখন কার্যত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিকল্প। তিনি এককভাবে পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এবং ব্যাংকের কৌশলগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবেন। তার সামনে প্রধান চারটি চ্যালেঞ্জ: গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা; তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা; বড় ঋণ ও খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করা; ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করা।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পর্যায়ে প্রশাসকের কাজ কেবল দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা নয়; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু প্রশাসক কতদিন?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত’ মোহাম্মদ জহির হোসেন দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ আপাতত কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, প্রশাসক ব্যবস্থা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত তিনটি ধাপ অনুসরণ করে: প্রথম ধাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা; দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং তৃতীয় ধাপে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময়ও লাগতে পারে।
পাঁচ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা কী বলছে?
গত বছরের নভেম্বর মাসে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছিল, ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে নতুন একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক গঠন করা হবে। পরবর্তীতে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নিয়োগ পেয়েছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রশাসক ব্যবস্থা স্থায়ী হয়নি; বরং পুনর্গঠনের একটি মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও কি একই পথ?
বিশ্লেষকদের অধিকাংশের ধারণা, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে একীভূতকরণের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ ইসলামী ব্যাংক এখনো দেশের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর ব্যাংকগুলোর একটি। এর শাখা নেটওয়ার্ক, আমানতভিত্তি, গ্রাহক সংখ্যা এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতা অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় শক্তিশালী। ফলে এটিকে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার পরিবর্তে পুনর্গঠন এবং নতুন পরিচালনা কাঠামো গড়ে তোলার পথেই হাঁটতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সাবেক ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান প্রশাসকের প্রধান কাজ হবে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন করা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নিতে পারবে।
নতুন পর্ষদ কবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো কোনো সময়সীমা ঘোষণা করেনি। তবে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং গ্রাহকদের আস্থা কিছুটা ফিরলে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচালক, পেশাদার ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন বোর্ড গঠনের সম্ভাবনা বেশি। অনেকেই মনে করছেন, অতীতের বিতর্কিত নিয়োগ থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই।
আড়াই হাজার কোটি টাকার চেয়েও বড় বিষয়
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের সমাধান অর্থ নয়; আস্থা। গত কয়েক দিনে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার জমা ও উত্তোলন হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এ কারণে প্রশাসকের প্রথম সাফল্য নির্ধারিত হবে গ্রাহকদের আচরণ দিয়ে। যদি আগামী কয়েক সপ্তাহে আমানত ফের বাড়তে শুরু করে এবং নগদ উত্তোলনের চাপ কমে যায়, তাহলে সেটিই হবে আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রথম লক্ষণ।
এস আলম-পরবর্তী বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সাম্প্রতিক বিতর্কের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মালিকানা ও সুশাসন সংকটও রয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ, ঋণ বিতরণ এবং করপোরেট শাসন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এ কারণে নতুন প্রশাসকের সামনে শুধু বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার কাজ নয়; অতীতের অনিয়মের প্রভাবও মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আস্থা ফিরলে দ্রুতই শেষ হতে পারে প্রশাসক অধ্যায়
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। প্রশাসকের লক্ষ্য ব্যাংক পরিচালনা করা নয়, বরং এমন একটি অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া যেখানে একটি শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নিতে পারে। সেই অর্থে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের ওপর।
যদি তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, গ্রাহকদের উদ্বেগ কমে এবং ব্যাংকের কার্যক্রম স্থিতিশীল থাকে, তাহলে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পথ দ্রুতই খুলে যেতে পারে। তবে যদি আস্থার সংকট দীর্ঘায়িত হয়, আমানত প্রত্যাহারের চাপ অব্যাহত থাকে কিংবা আর্থিক অনিয়মের নতুন তথ্য সামনে আসে, তাহলে প্রশাসকের মেয়াদও দীর্ঘ হতে পারে।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নয়; বরং আস্থা পুনর্গঠন করে স্বাভাবিক ও পেশাদার পরিচালনায় ফিরিয়ে আনা। এখন দেখার বিষয়, মোহাম্মদ জহির হোসেনের নেতৃত্বে সেই প্রত্যাবর্তন কত দ্রুত সম্ভব হয় এবং দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি আবার কত দ্রুত গ্রাহকদের পূর্ণ আস্থা ফিরে পায়।



