স্প্রেড ৪% নির্ধারণে এসএমই ঋণ সংকটের আশঙ্কা ব্যাংকগুলোর
স্প্রেড ৪% নির্ধারণে এসএমই ঋণ সংকটের আশঙ্কা

বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়ায় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (এসএমই) খাতে বেশি ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলো ক্ষোভ জানিয়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, এই খাতে ঋণের পরিচালন খরচ সবচেয়ে বেশি, যা ৪ শতাংশ স্প্রেড দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। ফলে অনেক ব্যাংক এসএমই খাতে নতুন ঋণ বিতরণ কমিয়ে দেবে, যা পুরো খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ব্যাংকগুলোর পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া

কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসএমই খাতকে ৪ শতাংশ স্প্রেডের বাইরে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানানোর পরিকল্পনা চলছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দিতে পারে।

এবিবির সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, 'ব্যবসার খরচ কমানোর জন্য স্প্রেড ৪ শতাংশ বেঁধে দেওয়া ভালো সিদ্ধান্ত। এতে সব ব্যবসায়ীর জন্য খরচ কমে আসবে। ছোট-বড় সবাই সমান হারে ঋণ পাবে। দেশের অর্থনীতির জন্য এর প্রয়োজন আছে। তবে এতে অনেক ব্যাংক চাপে পড়ে যাবে। ব্যাংকগুলোর মুনাফায়ও আঘাত আসতে পারে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্প্রেড নির্ধারণের পটভূমি

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, আমানত ও ঋণের সুদহারের গড় ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য নয়। নির্দেশনাটি জারির দিন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো সম্পদ দায় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা ছাড়া সুদের হার নির্ধারণ করতে পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে সুদহার নমনীয় করার নির্দেশনা রয়েছে। এ জন্য স্প্রেড ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নানা প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত আরও যাচাই-বাছাই করে নেওয়া ভালো হতো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমান সুদহার ও স্প্রেডের চিত্র

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গত এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ, অর্থাৎ স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। বহুজাতিক ব্যাংকগুলোতে স্প্রেড সবচেয়ে বেশি, কোনো কোনো বিদেশি ব্যাংকে তা ৯ শতাংশের বেশি। দেশের শীর্ষ মুনাফা করা ব্যাংকগুলোতেও ৪ শতাংশের বেশি স্প্রেড রয়েছে। সরকারি খাতের ব্যাংকে স্প্রেড সবচেয়ে কম, তবে এখনও তা সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি।

ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক ১৪ শতাংশ এবং প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইউসিবি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ দিচ্ছে। নতুন নির্দেশনা মানতে হলে ব্যাংকগুলোর সুদহারে বড় পরিবর্তন আনতে হবে।

এসএমই খাতে প্রভাব

এসএমই খাতে শীর্ষ ঋণদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, 'গড়ে আমাদের ব্যয় ও আয়ের অনুপাত ৪৫ শতাংশ, তবে সিএমএসএমই খাতে তা ৬৫ শতাংশ। এই খাতে ঋণ দেওয়ার খরচ অনেক বেশি। আমাদের জনবলের অর্ধেকই এই খাতের জন্য নিবেদিত। মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেড দিয়ে খরচ ওঠানো কঠিন। আমরা বেশ চিন্তিত। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই খাতে ঋণ বাড়ানোর বিকল্প নেই। আশা করি, দেশের স্বার্থে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।'

দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ গেছে কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে। ২০২৯ সালের মধ্যে এই হার ২৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ১ কোটি ১৭ লাখ সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তাই প্রথাগত ব্যাংকঋণের আওতার বাইরে।