মিকেল মেরিনোর গোল: বাবার উদযাপনের পুনর্জন্ম, ছেলের উত্তরাধিকার
মিকেল মেরিনোর গোল: বাবার উদযাপনের পুনর্জন্ম

গোল করে মিকেল মেরিনোর উদযাপন শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, বদলে দিয়েছে ইতিহাসও। শেষ ষোলোয় স্পেন-পর্তুগাল ম্যাচের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে মেরিনো ফাউল আদায় করে দ্রুত খেলা শুরু করেন, পাস দেন, আবার সামনে দৌড়ান। বল ফিরে আসে তাঁর কাছেই, এক স্পর্শে জড়িয়ে দেন জালে। গোলশূন্য সমতার ম্যাচে স্পেন এগিয়ে যায় ১-০ গোলে।

উদযাপনের পেছনের গল্প

গোলের পর মেরিনো ছুটে যান কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে। মুঠো শক্ত করে, মাথা পেছনে হেলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গর্জে ওঠেন। ডালাস স্টেডিয়ামে এই উদযাপন শুধু একটি গোলের নয়, বরং স্মৃতির পুনর্জন্ম। তিন দশকের বেশি আগে, ১৯৯১ সালের নভেম্বরে জার্মানির স্টুটগার্টে ঠিক একইভাবে উদযাপন করেছিলেন তাঁর বাবা মিগুয়েল মেরিনো। উয়েফা কাপে স্টুটগার্টের বিপক্ষে ওসাসুনার হয়ে গোল করেছিলেন তিনি। ছেলের জন্ম তখনো হয়নি (১৯৯৬ ইউরোয় ইংল্যান্ডের কাছে হেরে স্পেনের বিদায়ের দিনে জন্ম মেরিনোর)।

বাবার সঙ্গে মিল

২০২৪ ইউরোয় জার্মানির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের হেডে স্পেনকে সেমিফাইনালে তুলেও একই উদযাপন করেছিলেন মেরিনো। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘এই স্টেডিয়ামে নিশ্চয়ই আমাদের জন্য বিশেষ কিছু আছে। বাবা এখানে গোল করেছিলেন। তাই জায়গাটা আমাদের জন্য বিশেষ।’ বাবা মিগুয়েল মজা করে বলেছিলেন, ‘ওর উদ্দেশ্য ছিল আমাকে ছোট করা। আগে ভেবেছিলাম, স্টুটগার্টে গোল করার বিশেষত্ব শুধু আমারই। এখন সেটাও আর থাকল না।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন অধ্যায়: ছেলের ছেলে

এবার ডালাসে পর্তুগালের বিপক্ষে গোলের পর আবারও ফিরে এল সেই উদযাপন। তবে এবার গল্পটা আর শুধু বাবা-ছেলের নয়, ছেলের ছেলেরও। মেরিনো এখন নিজেও বাবা। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে পৃথিবীর আলো দেখেছে তাঁর ছেলে মার্কো। সন্তানকে ঠিকঠাক কাছে পাওয়ার আগেই তাঁকে ছুটে যেতে হয়েছে আর্সেনাল দলে, এরপর জাতীয় দলের ক্যাম্পে। ছেলের জীবনের প্রথম দুই মাসের বেশির ভাগ সময়ই মেরিনো পরিবার থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কঠিন পথ

মেরিনোর জন্য বিশ্বকাপে পৌঁছানোর পথটা কঠিন ছিল। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে গুরুতর চোটে পড়েন। ফেব্রুয়ারিতে অস্ত্রোপচার করতে হয়। প্রায় দুই মাস হাঁটতেই পারেননি, ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হয়েছে। শঙ্কা ছিল বিশ্বকাপ দলে থাকার জন্য নিজেকে ফিট প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন কি না। শেষ পর্যন্ত মাঠে ফেরেন মে মাসে, একা একা অনুশীলন করেন। এ সময় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে ছিলেন স্ত্রী। মেরিনো নিজেই জানিয়েছেন, ‘সাত-আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আমাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে সাহায্য করেছেন। ওই সময় আসলে আমারই ওকে সাহায্য করার কথা ছিল।’

গোলের পর আবেগ

পর্তুগালের বিপক্ষে গোলের পর সতীর্থরা যখন মেরিনোকে ঘিরে ধরেন, তখন সেই উল্লাসের ভেতর কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিতের আনন্দের পাশাপাশি মিশে ছিল দীর্ঘ পুনর্বাসনের দিনগুলো, সদ্যোজাত ছেলেকে বড় হতে না দেখার আক্ষেপ। ম্যাচের পর মেরিনো বলেন, ‘এমন মুহূর্তে সবকিছু মনে পড়ে। ভালো সময়, খারাপ সময়, বাড়িতে ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা। চোট, ছেলেকে বড় হতে না দেখতে পারা—এসবই আমাকে আরও শক্তি দিয়েছে।’

উত্তরাধিকার

ফুটবলে প্রায়ই বলা হয়, ছেলেরা বাবাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করে। মিগুয়েল মেরিনোর ক্ষেত্রে গল্পটা একটু অন্য রকম। তিনি কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন রেখে যাননি, বরং একটি স্মৃতি রেখে গিয়েছিলেন। ছেলে সেই স্মৃতিকে আরও বড় করলেন। এখন সেই গল্পের তৃতীয় অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে। হয়তো একদিন ছোট্ট মার্কোকে মিকেল মেরিনো দেখাবেন সেই দুটি ভিডিও—একটিতে স্টুটগার্টে গোল করে দৌড়াচ্ছেন তার দাদা, আর অন্যটিতে বিশ্বকাপে গোল করে একইভাবে কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে উদযাপন করছেন তার বাবা। সেদিন মার্কো বুঝবে, কিছু উদযাপন শুধু গোলের নয়, উত্তরাধিকারেরও।