ইসলামী ব্যাংকিংয়ে সংস্কার: শরিয়াহ বোর্ডের আইনি সুরক্ষা ও শক্তিশালীকরণের আহ্বান
ইসলামী ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ বোর্ডের আইনি সুরক্ষার আহ্বান

ইসলামী ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ বোর্ডের ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষার তাগিদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শরিয়াহ বোর্ডের কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকিং সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হলে শরিয়াহ বোর্ডকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় সংস্কারের ইঙ্গিত

গভর্নর সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শরিয়াহ মান্যতা শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দেন।

মোস্তাকুর রহমান জানান, শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করবে। তিনি বলেন, “শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্ন্যান্স নিশ্চিত হলেই প্রকৃত তদারকি ফিরে আসবে। তখন ব্যাংকে অনিয়ম বন্ধ হবে এবং কেউ অর্থ পাচার করতে পারবে না।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতীতের ত্রুটি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

গভর্নর উল্লেখ করেন, অতীতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে, যার মূল কারণ ছিল যথাযথ তদারকির অভাব। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং মূলত সম্পদভিত্তিক কাঠামোর উপর পরিচালিত হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে সেই কাঠামো পুরোপুরি অনুসরণ না হওয়ায় ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

পরবর্তীতে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি।

২০ দফা সুপারিশের মূল বিষয়

সভায় আলেম-উলামাদের পেশ করা ২০ দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • সুদমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও প্রতারণামুক্ত লেনদেন প্রবর্তন
  • শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, সেক্রেটারিয়েট ও অডিট শক্তিশালীকরণ
  • বড় বিনিয়োগে অন্তত ৩ সদস্যের শরিয়াহ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা
  • মুরাকিবদের (শরিয়াহ অডিটর) সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

সুপারিশগুলোতে আরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  1. স্বতন্ত্র ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়ন
  2. কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ
  3. পৃথক কমপ্লায়েন্স বিভাগ গঠন
  4. বছরে অন্তত একবার বাহ্যিক শরিয়াহ অডিট বাধ্যতামূলক করা

মানবসম্পদ ও বাজার সংস্কার

মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ব্যাংক পরিচালক ও এমডিদের শরিয়াহ জ্ঞান বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি আলেমদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যাংকে অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী অর্থনীতি বিভাগ চালুরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর্থিক ও বাজার সংস্কারের লক্ষ্যে শরিয়াহসম্মত মুদ্রাবাজার উপকরণ চালু, তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত আদায়ে কার্যকর নীতিমালা প্রচলনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতি দমন ও আঞ্চলিক হাব গঠনের পরিকল্পনা

সুপারিশে ইসলামী ব্যাংকিং যথাযথভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে অর্থপাচার বন্ধ করা, বড় দুর্নীতিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা এবং কঠোর ফৌজদারি শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।

আলোচনায় বাংলাদেশকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও উঠে আসে। এ জন্য গবেষণা কেন্দ্র ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন এবং বিশ্বখ্যাত শরিয়াহ স্কলারদের আমন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতি শাহেদ রহমানী, ড. মুফতি ইউসুফ সুলতানসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইসলামিক স্কলার ও খ্যাতিমান আলেম-উলামারা অংশ নেন।

এই মতবিনিময় সভা ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গভর্নরের বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক মান প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে।