এফওয়াই২৭-এর প্রাক-বাজেট আলোচনায় ব্যাংক কর কমানোর সুপারিশ
আগামী অর্থবছর ২০২৬-২৭ (এফওয়াই২৭)-এর বাজেটের প্রাক-আলোচনায় ব্যাংক কর্পোরেট কর হার ৩০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এবিবি)। রাজধানীর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে বুধবার অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় সংগঠনটি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মূলধনী আয়ের উপর করমুক্তিরও দাবি জানায়।
আট সংগঠনের অংশগ্রহণে বৈঠক
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেয় ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট আটটি সংগঠন। এগুলো হলো ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এবিবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)।
ট্রেজারি বন্ড কর নিয়ে বিতর্ক
এবিবির চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন বৈঠকে বলেন, "কয়েক দিন আগেও ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মূলধনী আয়ের উপর কোনো কর ছিল না। বর্তমানে এই আয়ের উপর ১৫ শতাংশ কর দেওয়া হচ্ছে, যা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।" তবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জবাব দেন, "ট্রেজারি বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়ও ব্যাংকের একটি আয়। ব্যাংকগুলো তাদের অন্যান্য আয়ের উপর ৩৭.৫ শতাংশ কর দেয়, কিন্তু ট্রেজারি বন্ডের অগ্রিম আয়কর মাত্র ১৫ শতাংশ। কেন এটি ৩৭.৫ শতাংশ হবে না, সেটাই প্রশ্ন।"
দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কর সুবিধার প্রস্তাব
আলোচনায় এবিবি আরও বলে যে, বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এবং অনেক ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু কর সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়। বিশেষ করে, শ্রেণিবদ্ধ ঋণের বিপরীতে রাখা নিরাপত্তা জামানত বা প্রোভিশনিংকে ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানানো হয়।
এ বিষয়ে এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, "২০০৬ সালের আগে শ্রেণিবদ্ধ ঋণের বিপরীতে রাখা প্রোভিশন ব্যয় হিসেবে গণ্য হতো। পরে একটি নোটিফিকেশন জারি করে এটিকে করযোগ্য করা হয়।" এনবিআর চেয়ারম্যান এর জবাবে বলেন, "প্রোভিশনিংয়ের পরবর্তী ধাপ হলো রাইট-অফ বা বাতিল। যদি রাইট-অফ করা হয়, তবে তা ব্যয় হিসেবে দাবি করা যেতে পারে।" তবে তিনি এও মন্তব্য করেন যে ব্যাংকগুলো রাইট-অফ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না।
আয়কর রিটার্ন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলককরণ নিয়ে মতপার্থক্য
এবিবির প্রতিনিধিরা বৈঠকে আরও বলেন, বর্তমানে ১০ লাখ টাকার বেশি মেয়াদি আমানত বা ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণের জন্য আয়কর রিটার্ন (পিএসআর) সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মানে হলো প্রচুর অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে না। এনবিআর চেয়ারম্যান এ বিষয়ে বলেন, "যারা নিয়মিত কর দেয়, তারা বারবার করের বোঝা বহন করছে। সরকারের একটি লক্ষ্য হলো এই কর বৈষম্য দূর করা।" তার মতে, আয়কর রিটার্ন সার্টিফিকেটের বিধান রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
পুঁজিবাজারে এসএমই ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তাব
আলোচনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পুঁজিবাজার উন্নয়নের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব করে। ডিএসই চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম বলেন, "যদি এসএমই খাতের কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করে পাঁচ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে দেওয়া হয়, তবে নতুন কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। এটি কোম্পানির সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করবে।"
এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে অ-নিবাসী ব্যক্তি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মূলধনী লাভের উপর পাঁচ বছরের করমুক্তির প্রস্তাব করে ডিএসই। বর্তমানে এই কর হার ১৫ শতাংশ। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, "পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ও আস্থা সৃষ্টি হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই আসবেন।" তিনি বলেন, বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা এসএমই কোম্পানিগুলোকে করমুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
বীমা কর কমানোর দাবি ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য
বৈঠকে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাঈদ আহমেদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্পোরেট কর হার ৩৭.৫ শতাংশ। কিন্তু বীমা কোম্পানিগুলোর আয় ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম। তাই তিনি দাবি করেন যে সেবা খাতের মতো বীমা কোম্পানিগুলোর কর হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে সকল নিবন্ধিত কোম্পানিকে কার্যকর তত্ত্বাবধানে আনার পরামর্শ দেয়। সংগঠনটির মতে, দেশে অনেক কোম্পানি নিবন্ধিত হলেও তাদের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার নিয়মিত কর দেয়।
বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৭ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে এটিকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া খুব শীঘ্রই একটি অনলাইন আয়কর রিফান্ড সিস্টেম চালু করা হবে। এতে করদাতারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের প্রাপ্য কর রিফান্ড পাবেন।



