ফাতেমা (রা.) ও আলী (রা.)-এর বিয়ে ও সংসার: এক অনন্য আদর্শ
ফাতেমা (রা.) ও আলী (রা.)-এর বিয়ে ও সংসার

ছবি: ফ্রিপিকন

পূর্ব সংকটকালে ও ইসলামের শৈশবকালীন কঠিন দিনগুলোতে ফাতেমা (রা.) মক্কার পবিত্র পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবন আমাদের জন্য উত্তম এক আদর্শ।

অতি সামান্য আসবাব আর অভাব-অনটনের মধ্যেও তাঁরা আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন এবং নবীজির সান্নিধ্যে থেকে একটি আদর্শ পরিবার গঠন করেছিলেন।

বিয়ে যেভাবে সম্পন্ন

মদিনায় হিজরতের পর নবীকন্যা ফাতেমার জন্য প্রস্তাব আসতে থাকে। আবু বকর (রা.) প্রথমে প্রস্তাব দেন, এরপর ওমর (রা.)। নবীজি তাঁদের প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে নীরব থাকেন যে দেখা যাক আল্লাহর পক্ষ থেকে কী ফয়সালা আসে। (বায়হাকি, দালায়িলুন নুবুওয়াহ, ৩/১৬০)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলী (রা.) বলেছেন, ফাতেমার বিয়ের প্রস্তাব আসছে শুনে তিনি রাসুলের দরবারে গিয়ে লজ্জায় নতমুখে চুপচাপ বসে থাকেন। রাসুল (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আলী, ফাতেমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ?’ তিনি সম্মতি জানালে নবীজি তাঁর কাছে দেনমোহর সম্পর্কে জানতে চান। আলীর কাছে একটি লৌহবর্ম আর একটি ঘোড়া ছিল। ঘোড়াটি যুদ্ধের জন্য আবশ্যক রেখে নবীজি লৌহবর্মটি মোহরের বিনিময়ে দিতে বলেন। (ইব্রাহিম আল-আলী, সহিহ আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃষ্ঠা ৬৬৭)

বর্মটি ওসমান (রা.) ৪৮০ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দিয়ে কিনে নেন এবং আলীকে সেটি উপহার হিসেবে দেন। নবীজি (সা.) ওসমানের জন্য কল্যাণের দোয়া করেন। (বাহাউদ্দিন আরবিলি, কাশফুল গুম্মাহ ফি মারিফাতিল আইম্মাহ, ১/৩৫৯)

মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের উপস্থিতিতে নবীজি (সা.) বিয়ের খুতবা পাঠ করেন। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধের পরে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন সংসারে নবীজির দোয়া

ফাতেমাকে স্বামীর ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কাজে হাজির ছিলেন আসমা বিনতে উমাইস (রা.)। পরদিন সকালে রাসুল (সা.) জামাতার বাড়িতে এসে একটি পাত্রে পানি নিয়ে আলীর বুক ও মুখের ওপর এবং ফাতেমার শরীরে ছিটিয়ে দেন। বলেন, ‘আমার বংশের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তির সঙ্গে তোমার বিয়ে দিয়েছি; আমি তাতে বিন্দুমাত্র কমতি করিনি।’ বিদায় দেওয়ার সময় রাসুলের দুই চোখে অশ্রু জমে এবং তিনি নিজ ঘরে ফিরে আসা উভয়ের জন্য দোয়া করতে থাকেন। (ইউসুফ কান্ধলবি, হায়াতুস সাহাবা, ২/৮৪৪)

অভাবের সংসারে প্রশান্তি

তাদের সংসার ছিল দুনিয়াবিমুখ ও সাদাসিধে। আলী (রা.) বলেন, আমি ফাতেমাকে বিয়ে করি; অথচ ঘুমানোর জন্য ছিল ভেড়ার চামড়ায় তৈরি একটা বিছানা মাত্র। দিনে সেটি দিয়েই পানি বয়ে আনা উটের ছায়া দিতাম। কোনো খাদেম ছিল না। (আলাউদ্দিন আল-হিন্দি, কানজুল উম্মাল, ৭/১৩৩, ৩২৮)

তাঁদের দিনগুলো কাটছিল চরম কৃচ্ছ্রসাধনায়। তাঁরা বেশ কয়েক দিন উপবাসে কাটিয়েছেন। একবার ক্ষুধার তীব্রতায় পথ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে কেনা আটার রুটি বানিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছিলেন। তবে অন্তরে ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। নবীজি সেই খাবারকে আল্লাহর থেকে প্রাপ্ত রিজিক অভিহিত করেছিলেন।

তসবিহ-এ-ফাতিমি

সাংসারিক কাজ করতে গিয়ে জাঁতা চালানোর কষ্টে ফাতেমার হাতে ফোসকা পড়ে যায়। একবার কিছু যুদ্ধবন্দী এলে তিনি বাবার কাছে যান একজন খাদেমের আশায়। কিন্তু অভাব দূর করতে নবীজি তাদের একটি আমল শিক্ষা দেন যে ঘুমাতে গেলে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। এটা খাদেম অপেক্ষা উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭০৫) এই তসবিহ পরবর্তী সময়ে তসবিহ-এ-ফাতিমি নামে খ্যাত হয়।

এই অনাড়ম্বর সংসারে জন্ম নেন হজরত হাসান, হোসাইন, জাইনাব, উম্মে কুলসুম ও মুহাসসিন (রা.)। নবীজির ইন্তেকালের মাত্র ছয় মাস পর মহীয়সী এই নারী ইন্তেকাল করেন।

ইলিয়াস মশহুদ : গবেষক ও লেখক