দেশের বীমা খাতে পেশাদারত্বের অভাব, চরম অব্যবস্থাপনা ও তদবিরের সংস্কৃতি বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা খাত নিয়ে গভীর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা পুরো খাতের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় বীমা খাতের সংকটের কথা
বুধবার (১ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, একসময় মোটর বীমা বাধ্যতামূলক ছিল এবং খুব অল্প খরচেই তা করা যেত। কিন্তু বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব থাকায় সেই বাধ্যবাধকতাও এখন আর কার্যকর নেই, যা খাতের অবনতির একটি বড় উদাহরণ।
মানুষের মধ্যে নেতিবাচকতা চরমে
তার ভাষ্য, পুরো বীমা খাত নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচকতা এখন চরমে পৌঁছেছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, একদিকে বীমা কোম্পানিগুলো ব্যবসা না থাকার অভিযোগ করছে, অন্যদিকে নতুন বীমা কোম্পানির লাইসেন্সের জন্য এখনও নানা মহল থেকে তদবির করা হচ্ছে। এই দ্বৈততা খাতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
দক্ষ জনবলের মারাত্মক ঘাটতি
বীমা খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে আবদুর রহমান খান বলেন, দেশে কার্যত কোনও অ্যাকচুয়ারি নেই। অথচ বীমা খাতে অ্যাকচুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেশা, যা ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নীতি নির্ধারণে অপরিহার্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাত্র দুজন অ্যাকচুয়ারি আছেন। এর মধ্যে একজনের বয়স ৮৮ বছর পার হয়েছে। আরেকজন তুলনামূলক তরুণ, যিনি আমার মেয়ে। এই পরিস্থিতিতে খাতে শৃঙ্খলা আনা কীভাবে সম্ভব? এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
গ্রাহকদের ভোগান্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। বিশেষ করে জীবন বীমার মেয়াদ শেষে গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পেতে দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, মানুষ সারাজীবন প্রিমিয়াম দেয়, কিন্তু ম্যাচিউরিটির পর টাকা পেতে হিমশিম খায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বীমা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও অবসরের পর তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।
তদবিরের সংস্কৃতি ও সুশাসনের অভাব
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় তার কাছেও এমন তদবির আসে যেখানে দেখা যায়, কোনও বীমা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাওনা সুবিধা আটকে রাখা হয়েছে। বীমা খাতে সুশাসন নিশ্চিত না হলে মানুষের আস্থা ফিরবে না বলে সতর্ক করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে মানুষ মনে করবে সরকার জোর করে বীমা কোম্পানিগুলোকে লাভবান করতে চাইছে, যা জনবিশ্বাসের জন্য ক্ষতিকর।
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। প্রাক-বাজেট আলোচনায় অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা তাদের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই আলোচনায় বীমা খাতের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বারবার উঠে এসেছে।
সর্বোপরি, এনবিআর চেয়ারম্যানের এই মন্তব্য বীমা খাতের বর্তমান সংকটকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করেছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি জরুরি সংকেত হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



