জ্বালানি সাশ্রয়ে পিকেএসএফের নির্দেশনা, কিন্তু বাস্তবে গাড়ি ব্যবহার অব্যাহত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত সংকটের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা উদ্যোগ চলছে। সে ধারাবাহিকতায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) জ্বালানির ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা মোকাবিলায় পিকেএসএফ জ্বালানির ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তার জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
নির্দেশনা বাস্তবায়নে চিত্র ভিন্ন
গত রোববার জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দেওয়ার পর সোমবার ও মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফ ভবনে সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বেশির ভাগ কর্মকর্তা অফিসের গাড়িই ব্যবহার করছেন। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোবাসগুলো কর্মকর্তাদের নিয়ে আসছে। অফিসের গাড়িতে চড়ে অফিসে আসেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, এমডিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
একাধিক গাড়িচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কর্মকর্তাদের বহন করা পিকেএসএফের মাইক্রোবাসের সংখ্যা আট। এ ছাড়া উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তার যানবাহন–সুবিধা দেয় পিকেএসএফ। যেসব কর্মকর্তার অফিসের গাড়ি রয়েছে, তাঁদের অনেকে আসেন সেই গাড়িতে চড়ে। কয়েকজন কর্মকর্তাকে ভবনের কাছাকাছি দূরত্বে নেমে হেঁটে অফিসে ঢুকতে দেখা যায়। কিছু কর্মকর্তা অটোরিকশায় কিংবা হেঁটেও অফিসে আসেন।
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের অবশ্য দাবি করছেন, বেশির ভাগ কর্মকর্তাই নির্দেশনা মানছেন। সবাই যাতে নির্দেশনা মানেন, সে জন্য ধীরে ধীরে আরও কঠোর হবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। মাইক্রোবাস চালানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব মাইক্রোবাসকে তাঁরা গণপরিবহন হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ, প্রতিটি গাড়িতে ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তা যাতায়াত করেন। তাই এগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
ফজলুল কাদের যোগ করেন, ‘বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিগগিরই ৫০% জ্বালানি সাশ্রয় পুরোপুরি কার্যকর হবে। ধীরে ধীরে আমরা এ বিষয়ে আরও কঠোর হব।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, দাপ্তরিক কাজে গাড়ি ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে এবং কর্মকর্তারা গণপরিবহন ব্যবহার করছেন বলে দাবি করেন।
জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোয় তেল-গ্যাসের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানির বাজার এখন অস্থির। বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলোয়। চাহিদামতো তেল না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোববার জ্বালানি সাশ্রয়ের ঘোষণা দেয় পিকেএসএফ কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
শুধু একটি দপ্তর নয়, জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘সবার আগে মন্ত্রীদের জ্বালানি সাশ্রয় করতে হবে। তাঁদের দেখে সচিবেরা বাধ্যতামূলক জ্বালানি সাশ্রয় করবেন। একে একে সব প্রতিষ্ঠান জ্বালানিসাশ্রয়ী হবে।’ সরকারি সব অফিসে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘অপার সুযোগ-সুবিধা’ নিয়ন্ত্রণের কথাও বলেন তিনি।
এম শামসুল আলম আরও যোগ করেন, ‘তাঁদের ভোগবিলাসিতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকার বিপদে পড়বে।’ তাঁর মতে, সামগ্রিক উদ্যোগ না নিলে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ সফল হবে না এবং কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পিকেএসএফের একাধিক জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপককেও অফিসের গাড়িতে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। কয়েকজন গাড়িচালক জানান, নির্দেশনা দেওয়ার পর কিছু গাড়ির চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে অনেকে এখনো যাতায়াতের জন্য গাড়ি ব্যবহার করছেন। ঢাকার বাইরে দাপ্তরিক কাজে যাতায়াতের জন্য পিকেএসএফের পরিবহন ব্যবহার বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এক ব্যক্তিগত গাড়িচালকের সঙ্গে কথা হয়, যিনি পিকেএসএফের গাড়ি চালালেও তাঁর নিয়োগ চুক্তি হয় পিকেএসএফের কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি নিয়োগকর্তাকে অফিসে আনা-নেওয়ার পর গাড়ি পিকেএসএফ ভবনেই রাখেন। জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনার বিষয়ে এই গাড়িচালক বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না এবং নিয়োগকর্তাও কিছু বলেননি।
পিকেএসএফের এ উদ্যোগ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয় টেকসই হয়।



