সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা কাটছাঁট প্রত্যাহারের দাবিতে প্রশাসকরাও সোচ্চার
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকরাও মুনাফা কাটছাঁট বা হেয়ারকাট সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা কয়েক দফায় বাংলাদেশ ব্যাংককে এই বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের মতে, মুনাফা কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আস্থার সংকট থাকলে এই ব্যাংক কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ ও হেয়ারকাট ইস্যু
ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা হেয়ারকাট প্রত্যাহারের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য প্রথমে সব শেয়ারে শূন্য মুনাফা ঘোষণা করা হয়। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে ব্যক্তি আমানতের ওপর ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা এখনো কোনো মুনাফা পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হেয়ারকাট প্রত্যাহারে আলোচনা চলছে কিন্তু এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও একই কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, হেয়ারকাট প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
৭৬ লাখ আমানতকারীর ভাগ্য ঝুলে আছে
মুনাফায় কাটছাঁট বা হেয়ারকাটে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ভাগ্য ঝুলে আছে। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হেয়ারকাট সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। তারা বলছেন, সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দেওয়া এই সিদ্ধান্ত তারা মানতে নারাজ। টাকা কিছু দিন পরে দিলেও তারা মেনে নেবেন, কিন্তু মুনাফা কেটে নেওয়া তাদের জন্য সহ্য করা সম্ভব নয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, হেয়ারকাট প্রত্যাহার করে নিলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসতে পারে। অন্যথায় এই ব্যাংক কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা পাবেন না। এই মুনাফা কাটছাঁটের সিদ্ধান্তকেই হেয়ারকাট হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক্সিম ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। কিন্তু হেয়ারকাটই একমাত্র সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। শুধু এই কারণেই সাধারণ আমানতকারীরা আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না। তাই হেয়ারকাট বাতিল করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা
শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচ ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আইটি ইন্ট্রিগেশনসহ একীভূতকরণ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকে নিয়োগ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসক ও সহযোগীদের নিয়ে বৈঠক করে এ নির্দেশনা দিয়েছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। ১৫ মার্চ গভর্নর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে একীভূতকরণ দ্রুত সম্পন্ন করার বিকল্প নেই।
বৈঠকে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক ও তাদের চারজন করে সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। গভর্নর ব্যাংকগুলোর আইটি ইন্ট্রিগ্রেশন কেন দেরি হচ্ছে সে বিষয়ে জানতে চান। কর্মকর্তারা ব্যাংকগুলোর আলাদা আলাদা ডেটা একত্রিত করতে সময় দরকার হচ্ছে বলে জানান। বৈঠকে উপস্থিত কিছু কর্মকর্তা একীভূতকরণ চলমান থাকবে কিনা এ নিয়ে গুজব ছড়ানোর কথা তুলে ধরেন। জবাবে গভর্নর বলেন, সরকার ইতিমধ্যে নতুন এই ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে। আমানত বিমা তহবিল থেকে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। একীভূতকরণ থেকে পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।
এর আগে ৩ মার্চ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের নিয়ে বৈঠক করেন গভর্নর। বৈঠকে শিগগিরই এই ব্যাংকের এমডি নিয়োগ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রশাসকদের যথানিয়মে কাজ চালিয়ে যেতে বলেন। যে কোনো উপায়ে এসব ব্যাংকের ঋণ আদায় জোরদার করতে বলেন। একই সঙ্গে পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে পরিচালিত যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে আছে, সেগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে বলেন।



