ব্যাংকিং খাতে সংস্কার অব্যাহত রাখার ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংকের
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে চলমান সব সংস্কার কার্যক্রম, যার মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের একত্রীকরণও অন্তর্ভুক্ত, তা অব্যাহত থাকবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন যে কোন রাজনৈতিক চাপই এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।
ব্যাংকারদের সংগঠনের সাথে বৈঠকে গভর্নরের বক্তব্য
রবিবার (১ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর একটি শুভেচ্ছা সভায় তিনি এ সব কথা বলেন। এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিনের নেতৃত্বে ১৯টি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা এ বৈঠকে অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, গভর্নরের এই বার্তা বেসরকারি খাতের এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের একত্রীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি বিভ্রান্তির একটি জবাব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে বৈঠকে গভর্নর সংস্কার অব্যাহত রাখার বিষয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা শক্তিশালীকরণের কথাও উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও অর্থায়নে বিশেষ নির্দেশনা
গভর্নর নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যবসা ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন। তিনি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে এবং সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন জোরদার করার নির্দেশনা দেন।
ডিফল্ট ঋণ থেকে সৃষ্ট অলাভজনক সম্পদের উৎপাদনমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গভর্নর গুরুত্বারোপ করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি নতুন উদ্যোক্তা বা সেবামুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা
বৈঠক শেষে মাশরুর আরেফিন সাংবাদিকদের জানান, ঋণ বিতরণ বা সুশাসনের বিষয়ে কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হলে সরাসরি গভর্নরকে জানানোর জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। এবিবি উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয় দ্রুত সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
ব্যবসায়িক খরচ কমানোর উদ্যোগ
গভর্নর ব্যবসায়িক খরচ কমানোর লক্ষ্যে কিছু বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। এর অংশ হিসেবে শাখা খোলার জন্য আঞ্চলিক ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলে ব্যাংকগুলোর আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। লিজ চুক্তিও নীতির আওতায় স্বাধীনতা দেওয়া হবে।
এছাড়া বৈঠকে রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা প্রদান, ইডিএফ প্রত্যয়ন এবং রেমিট্যান্স প্রণোদনা বকেয়া বিষয়গুলোও উত্থাপন করা হয়।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা
গভর্নর বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের আকর্ষণের জন্য এই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে একটি 'বাংলাদেশ দিবস' আয়োজনের ধারণা দেন। তিনি 'এক গ্রাম, এক পণ্য' উদ্যোগেরও উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি কিশোরগঞ্জের আষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনির বিশ্ববাজারে নিয়ে আসতে ব্যাংকগুলোর সহায়তার কথা বলেন। একইভাবে তিনি জেলা ও গ্রামভিত্তিক সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে অর্থায়ন ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা প্রদানের ওপর জোর দেন।
বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান, গভর্নর শুরুতে সবার মতামত মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং পরে তার অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেন। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, সুশাসন ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে—এই আশ্বাসের মধ্য দিয়ে বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে।
