বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান: রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান: রাজনীতি ও অর্থনীতির সংঘাত

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর: রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. অ্যালান গ্রিনস্প্যানকে ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ 'রকস্টার' হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, যা গ্রিনস্প্যানের দীর্ঘ ১৮ বছরের স্বাধীন ও বুদ্ধিদীপ্ত নীতিনির্ধারণের স্বীকৃতি ছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান কাজ শুরু করার আগেই ব্যাপক আলোচনায় চলে এসেছেন, তবে তা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, অর্থ মন্ত্রণালয় আকস্মিকভাবে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

নিয়োগের পেছনের রাজনৈতিক প্রভাব

মোস্তাকুর রহমান শিক্ষাগতভাবে একজন হিসাববিদ এবং পেশায় পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ী, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন কার্যকর সদস্য ছিলেন। এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের গভর্নর নিয়োগে দলীয় সমর্থকদের অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা প্রশ্ন তুলেছে: এই দলে কি অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকিং বা পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞের অভাব পড়েছে? প্রায় অর্ধশতাব্দী বয়সী একটি দলের জন্য এই সিদ্ধান্ত গুণীশূন্যতার চেয়ে সুচিন্তিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ ও নৈতিক দ্বন্দ্ব

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৮৬ কোটি টাকার একজন ঋণখেলাপি, যদিও গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে তিনি ঋণের কিয়দংশ পরিশোধ করে এটিকে 'নিয়মিত' ঋণে পরিণত করেছেন। এই ইতিহাস খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে তাঁর শক্ত অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। বাংলাদেশে শতকরা ৪০ ভাগ খেলাপি ঋণ এশিয়ার সর্বোচ্চ এবং বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা, যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিতে পারে। গভর্নর হিসেবে তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে এই সংকট মোকাবিলা করা, যা বিএনপি সরকারের জন্যও দুর্ভাবনার বিষয়।

আহসান এইচ মনসুরের অপসারণ ও এর প্রভাব

ড. আহসান এইচ মনসুর ছিলেন একজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক, যিনি কোনো গোষ্ঠীস্বার্থের দায়িত্ব নেননি। তাঁর আকস্মিক অপসারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিগত সময়ে, মনসুরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু ইতিবাচক কাজ করছিল, যা সরকারের অন্যান্য দপ্তরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। তাঁর অপসারণের পদ্ধতি সরকারের জন্য শুভ বার্তা বয়ে আনেনি, বরং এটি রাজনৈতিক প্রভাবের পুনরুত্থানকে নির্দেশ করে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান নির্বাচনে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই হয়, কারণ গভর্নরের সততা, দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার ওপর দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে, যেখানে আকস্মিক নিয়োগ ও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে গভর্নর নির্বাচন করলে ভুলের আশঙ্কা কমে যেত এবং সরকারের দায়ভাগ হ্রাস পেত।

ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা

মোস্তাকুর রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তাঁর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা একটি বাড়তি সুবিধা হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও নৈতিক দ্বন্দ্ব এই দায়িত্বকে জটিল করে তুলেছে। বিএনপি সরকারের 'মেধাতান্ত্রিক বাংলাদেশ' গড়ার প্রতিজ্ঞার সাথে এই নিয়োগের সঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত, গভর্নরের সফলতা নির্ভর করবে তাঁর স্বাধীন নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার উপর।