বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান: ইতিহাসে প্রথম নিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। নতুন বিএনপি সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমানকে, যিনি পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এই নিয়োগ দেশের ভেতরে ব্যাপক চমক সৃষ্টি করেছে, কেননা এর আগে কখনোই কোনো ব্যবসায়ীকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে গভর্নর নিয়োগ
আন্তর্জাতিকভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত আর্থিক বাজার, অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ছিলেন মার্ক কার্নি, যিনি কানাডার নাগরিক হিসেবে দুই দেশের গভর্নর হওয়ার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তবে বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশে এই নিয়োগ আন্তর্জাতিক মহলে সীমিত আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
নীতিমালা ও আইনি কাঠামো
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী। এই আইনে গভর্নর নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো যোগ্যতা বা নীতিমালা উল্লেখ নেই। সরকার চাইলে যেকোনো ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দিতে পারে, এবং মেয়াদ চার বছর নির্ধারিত, যা বাড়ানোও সম্ভব। ২০২৪ সালে আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেওয়ার সময় গভর্নরের বয়সসীমাও তুলে নেওয়া হয়েছিল।
বেশির ভাগ দেশে, যদিও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকলেও, গভর্নর পদে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পরিচয় বা সমর্থনকে এই ক্ষেত্রে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। উন্নত দেশগুলোতে, যেমন কানাডায়, আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে গভর্নরের অবশ্যই আর্থিক বাজার ও আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
বাংলাদেশের পূর্ববর্তী গভর্নরদের ইতিহাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম গভর্নর ছিলেন আ ন ম হামিদুল্লাহ, যিনি পাকিস্তানের ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে গভর্নর পদে নিয়োগ পেয়েছেন আমলা, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষকরা। উদাহরণস্বরূপ, এম নূরুল ইসলাম ছিলেন প্রথম আমলা গভর্নর, এবং আতিউর রহমান ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক। ২০২৪ সালে আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের মাধ্যমে আমলা ও অর্থনীতিবিদদের ধারা ভেঙে এখন প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ী এই দায়িত্ব পেলেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে মুদ্রানীতি প্রণয়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি করা, এবং সরকারকে অর্থনৈতিক পরামর্শ প্রদান। গভর্নরকে এই কাজগুলো করতে হলে অরাজনৈতিক ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রায়শই সমালোচিত হয়েছে, যেখানে আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ব্যাংক দখলের ঘটনাগুলোতে ব্যাংকের ভূমিকা সহায়তাকারীর মতো ছিল। নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের কাছে এখন চ্যালেঞ্জ হলো ঋণখেলাপি সমস্যা সমাধান এবং আর্থিক খাতকে নিরাপদ রাখা। ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি এই ইস্যুগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারেন বলে আশা করা যায়।
স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ৩৮এ ধারা অনুযায়ী, গভর্নরকে বছরে একবার সংসদীয় কমিটিতে মুদ্রানীতি নিয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে, কিন্তু এই বিধান অতীতে কখনোই পুরোপুরি মানা হয়নি। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি উভয়ই নিশ্চিত করা হয়, কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। নতুন গভর্নরের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে এই কাঠামো উন্নয়নের ওপর।
সারসংক্ষেপে, মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে, এবং এই নিয়োগের প্রভাব সময়ের সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
