বিআইবিএম সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: সুদহারের ওঠানামা ব্যাংক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, উচ্চ সুদহার কিংবা নিম্ন সুদহার—দুটোই ব্যাংক খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। তাদের মতে, সুদহার কমে গেলে ব্যাংকের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, অন্যদিকে সুদহার বেড়ে গেলে ঋণখেলাপির হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়।
মুদ্রানীতি ও ব্যাংকের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা
রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম মিলনায়তনে বুধবার সকালে ‘মুদ্রানীতি ও ব্যাংকের সম্পৃক্ততা’ শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের উপদেষ্টা মো. আহসান উল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) মোহাম্মাদ সালাউদ্দিন নাসের।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মুদ্রানীতির বাস্তব প্রয়োগ, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণপ্রবাহ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আকন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বলেন, ‘মুদ্রানীতি এককভাবে কাজ করে না। এটাকে রাজস্ব নীতি, বাণিজ্য নীতি এবং মুদ্রা বিনিময় হার নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, সুদের হার বেশি বা কম উভয়ই ব্যাংকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সুদের হার নির্ধারণ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
সুদের হার কত হওয়া উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে আকন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন বলেন, ‘যদি মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশ হয়, তবে ব্যাংকঋণের সুদের হার ৮ শতাংশ হতে পারে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়লে, সেটা ব্যবস্থাপনার জন্য বিনিময় হার একটি বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
সভাপতির বক্তব্যে বিআইবিএমের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘সুদহারের সঙ্গে বিনিয়োগের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই; বরং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সুবিধার বিষয়গুলো বিনিয়োগের সঙ্গে বেশি যুক্ত। অতীতে আমরা দেখেছি, ঋণের সুদ একক অঙ্কে নামিয়ে আনার পরও খুব বেশি বিনিয়োগ বাড়েনি।’ তিনি আরও জানান, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাব পড়তেও কিছুটা সময় লাগে।
আমদানি বৃদ্ধি ও ঋণখেলাপির চ্যালেঞ্জ
নির্বাচিত সরকার আসায় আমদানি আরও বাড়বে বলে মনে করেন মো. এজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমদানি বাড়লে বিনিময় হারের ওপর চাপ পড়বে, তবে রিজার্ভ ভালো থাকায় এ চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হবে না। তবে আমদানি কতটা বাড়বে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সদস্য মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, ‘ব্যাংক খাতে ৩৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতির জন্য বহনযোগ্য নয়।’ তিনি মন্তব্য করেন, এত বিশাল ঋণখেলাপির চিত্র কার্পেটের নিচে রাখাই ভালো ছিল। তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি সরবরাহব্যবস্থার কারণে হচ্ছে, এটার সঙ্গে মুদ্রানীতির সম্পর্ক নেই। তাই মুদ্রানীতি দিয়ে এটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সঠিক পদক্ষেপ কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়।
সেমিনারে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন:
- মুদ্রানীতির বাস্তব প্রয়োগ ও চ্যালেঞ্জ
- ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল
- ঋণপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্পর্ক
- সুদহারের ওঠানামার প্রভাব বিশ্লেষণ
এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সুদহারের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুদ্রানীতির সঠিক প্রয়োগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
