বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুরের বিদায়, মোস্তাকুর রহমান নতুন গভর্নর নিযুক্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন, মোস্তাকুর রহমান নিযুক্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বড় পরিবর্তন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে একটি উত্তাল দিনের অবসান ঘটেছে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের মাধ্যমে। কয়েক দিন ধরে চলা কর্মকর্তাদের তীব্র আন্দোলনের পর আজ তাঁর স্থলে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো একজন পেশাদার ব্যবসায়ী ও হিসাববিদকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানো হলো, যা আর্থিক খাতে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও উত্তেজনার দিন

আজ সকাল থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হন। তাঁদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল তিন কর্মকর্তার কারণ দর্শানো ও বদলির আদেশ প্রত্যাহার, পাশাপাশি গভর্নরের পদত্যাগ। বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের আয়োজনে এই প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। গভর্নর আমাদের ন্যায্য দাবিগুলো আমলে নেননি, বরং দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে গভর্নরের মন্তব্যে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় জবাবদিহিতা প্রয়োজন।

গভর্নরের পদত্যাগের দাবি ও কলমবিরতির হুমকি

অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ ঘোষণা দেন যে যদি আজকের মধ্যে শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ দাবিগুলো পূরণ না হয়, তাহলে আগামীকাল থেকে কর্মকর্তারা প্রতীকী কলমবিরতিতে যাবেন। তিনি গভর্নরের স্বৈরাচারী পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান এবং দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, ‘গত সাত-আট মাস ধরে আমরা ন্যায্য দাবি জানিয়েছি, কিন্তু গভর্নর তা মানেননি। আমরা আশা করি, তিনি আমাদের দাবিগুলো মেনে নেবেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় পদক্ষেপ নেবেন।’

আহসান মনসুরের চূড়ান্ত বক্তব্য ও অভিযোগ

কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের পর আহসান এইচ মনসুর একটি তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় পরিচালিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন করছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষা একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য অপরিহার্য, বিশেষ করে যখন আর্থিক খাত কাঠামোগত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

গভর্নর আরও দাবি করেন যে একটি কুচক্রী মহল সাধারণ কর্মকর্তাদের ভুল পথে পরিচালিত করে ব্যাংকগুলোকে পুরোনো ‘লুটেরা’ মালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং ঋণখেলাপি মালিকদের কাছে ফেরত যেতে দেওয়া হবে না।

নতুন গভর্নর নিয়োগ ও উত্তেজনার চূড়ান্ত পর্ব

আহসান মনসুরের সংবাদ সম্মেলনের পরই নতুন গভর্নর নিয়োগের আলোচনা শুরু হয় এবং দ্রুত মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর আহসান মনসুর বাসায় চলে যান, যেখানে কর্মকর্তারা তাঁকে বিদায় জানান। তবে উত্তেজনা থামেনি; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘মব’ তৈরি করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। এই ঘটনায় অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলামসহ প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, যারা ‘ধর ধর’ স্লোগান দিতে থাকেন।

বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এই পরিবর্তন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারত, কিন্তু হঠাৎ গভর্নর পরিবর্তনে ভালো বার্তা যায় না। আহসান মনসুর জ্ঞানী মানুষ ছিলেন এবং তাঁর সময়ে অনেক ভালো কাজ হয়েছে, যেমন পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন।’ তিনি আরও যোগ করেন যে গভর্নরের পদটি সংবেদনশীল এবং আর্থিক নীতি, বিদেশি ঋণ ও দাতা সংস্থার সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

এই পরিবর্তন বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবেলা করে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, তা এখন সবার নজরে থাকবে। উত্তেজনা ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই নতুন অধ্যায় দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।