ব্যাংক একীভূতকরণের বিরুদ্ধে 'কুচক্রী মহলের অপপ্রচার' চলছে: বিদায়ী গভর্নর আহসান মনসুর
ব্যাংক একীভূতকরণে 'কুচক্রী মহলের অপপ্রচার': গভর্নর

ব্যাংক একীভূতকরণের বিরুদ্ধে 'কুচক্রী মহলের অপপ্রচার' চলছে: বিদায়ী গভর্নর আহসান মনসুর

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) ও দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারের চেষ্টার বিরুদ্ধে একটি 'কুচক্রী মহল অপপ্রচার' চালাচ্ছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ তোলেন।

কর্মকর্তা বদলি ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি

মঙ্গলবার কারণ দর্শানোর চিঠি পাওয়া তিন কর্মকর্তাকে 'তাৎক্ষণিক' ঢাকার বাইরে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবনের সামনে প্রতিবাদ সভা করে। সভায় বলা হয়, কারণ দর্শানোর নোটিস ও বদলির আদেশ প্রত্যাহার না করলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলম বিরতিতে যাবেন কর্মকর্তারা।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই গভর্নর ভবনের চতুর্থ তলায় জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন। আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'ব্যাংক একীভূতকরণ ও দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধার করার চেষ্টার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিছু কর্মকর্তা ষড়যন্ত্র করছেন। মার্জার হওয়া ব্যাংক আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরিয়ে নিতে একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে।'

ব্যাংক একীভূতকরণের বিস্তারিত

আর্থিক সংকটে জেরবার শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংকগুলো হলো:

  • এক্সিম ব্যাংক
  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
  • গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
  • ইউনিয়ন ব্যাংক
  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক

গভর্নর বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই সরকারি নীতিগত বিষয়ে প্রশ্ন তোলার। এটি তাদের আওতাভুক্ত বিষয় নয়। যারা অপপ্রচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'

বদলিকৃত কর্মকর্তাদের পরিচয়

শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিস পাওয়া তিন কর্মকর্তাকে মঙ্গলবার তাৎক্ষণিক বদলির আদেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সরকার গঠনের আগে ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন পাচ্ছে— এমন অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন ডাকার ঘটনায় এ তিন জনকে দুদিন আগে কারণ দর্শাতে বলেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বদলির মুখে পড়া তিন কর্মকর্তা হলেন:

  1. বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল ঢাকার সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ
  2. সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ
  3. নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা

বুধবার তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তারা সেখানে না গিয়ে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন। বদলির আদেশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক কর্মকর্তা দীর্ঘ পোস্ট লেখেন, যেখানে গভর্নরকে 'স্বৈরাচার' হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

গভর্নরের প্রতিক্রিয়া ও পদত্যাগের ইস্যু

এ বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'শোকজের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করব, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানবো না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।'

তার পদত্যাগের দাবির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, 'পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।'

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে অবশ্যই সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই আমরা এগোচ্ছি।'

ডিপোজিটর স্বার্থ রক্ষার দাবি

গভর্নর আরো বলেন, সাতটি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটির মার্জার কোনো স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের বিষয় নয়। এটি সরকারি নীতিগত ও পলিটিক্যাল ইকোনমির বিষয়। ৭৬ লাখ ডিপোজিটরের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনতে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতেই এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি ব্যাংক একীভূতকরণ নীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন এবং এর বিরোধিতাকারীদের 'কুচক্রী মহল' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।