ব্যাংক খাতে বড় ঋণে খেলাপি হার ৫১%, ছোট ঋণে মাত্র ২১.৫৫%
বড় ঋণে খেলাপি হার ৫১%, ছোট ঋণে ২১.৫৫%

ব্যাংক খাতে বড় ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনক, ছোট ঋণে তুলনামূলক ভালো অবস্থা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৫ শতাংশই ১০ কোটি টাকার কম ছোট ও মাঝারি গ্রাহকের ঋণ। উচ্চ সুদের হার সত্ত্বেও এসব ঋণের মাত্র ২৫ শতাংশ খেলাপি হয়েছে। বিপরীতে, সবচেয়ে বেশি খেলাপির হার দেখা গেছে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে, যেখানে খেলাপির হার ৫১ শতাংশ। ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৫০ কোটি টাকার ওপরে, এবং এসব ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ শোধের উচ্চ মনোভাব

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নিলেও, তারা সেই ঋণ পরিশোধে অত্যন্ত তৎপর। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগও কম। অন্যদিকে, বড় অঙ্কের ঋণে সুদহার কম থাকলেও, বড় গ্রাহকেরা ঋণ ফেরত দিতে নানা গড়িমসি করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধ না করেও নানা ধরনের ছাড় পান।

বড় ঋণে খেলাপি হার ও জাতীয় সমস্যা

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, ‘বড় গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ থাকে। এ জন্য তাঁদের অনেকেই মনে করেন, ঋণ নেওয়ার পর আর ফেরত দিতে হবে না। এটা এখন আমাদের দেশের জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার সমাধান এবার না হলে আর কখনো হবে না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ছোট ও মাঝারি গ্রাহকেরা ব্যবসার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, তাই তারা যেকোনো উপায়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকেন এবং ঋণও ঠিক রাখেন।

খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার ৩৬.৩ শতাংশ খেলাপি। বিশদে:

  • ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ১৫.২ শতাংশ।
  • ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ২৭.৯ শতাংশ, গড়ে ২১.৫৫ শতাংশ।
  • ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ৪৮ শতাংশ।
  • ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে খেলাপির হার সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ।

বড় ঋণে অনিয়ম ও ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, বিগত সময়ে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছে, এবং প্রচলিত ধারার কিছু ব্যাংকেও বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম ঘটেছে। খেলাপির দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক হলো ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, পদ্মা ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, যেখানে খেলাপির হার ৯১.৩৮% থেকে ৯৬.৬৪% পর্যন্ত। কিছু ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে, যা নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সাইফুল আলমের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা করে টিকে থাকেন, তাই তাঁরা ভালো করছেন। তাঁদের জন্য নানাবিধ সুবিধা চালু করা হয়েছে, যা খেলাপি ঋণ কমাতে সাহায্য করছে।’ সামগ্রিকভাবে, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখলেও, বড় ঋণে খেলাপির উচ্চ হার ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।