ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের চার স্তম্ভ: সুশাসন, মূলধন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও নীতির সমন্বয়
ব্যাংকিং সংস্কার: সুশাসন, মূলধন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও নীতির সমন্বয়

ব্যাংকিং খাতের সংকট ও সংস্কারের পথ: মাসরুর আরেফিনের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের নতুন সরকার একটি জটিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যা তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত দুর্বলতায় আক্রান্ত। এই দুর্বলতাগুলো হলো দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা গভর্ন্যান্স, দুর্বল ব্যালান্স শিট বা আর্থিক স্থিতিপত্র এবং নীতি সিদ্ধান্তে জনগণের ক্রমাগত হ্রাসপ্রাপ্ত বিশ্বাস। মাসরুর আরেফিন, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এই বিষয়গুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং সংস্কারের জন্য চারটি মূল স্তম্ভের প্রস্তাব দিয়েছেন।

প্রথম স্তম্ভ: গভর্ন্যান্স ফার্স্ট নীতির প্রয়োগ

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো সম্পদের গুণগত মান ও সুশাসনের অভাব। ভয়াবহ উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, বারবার ঘটে যাওয়া ঋণ জালিয়াতির ঘটনা এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদানের প্রবণতা এই খাতের ওপর মানুষের আস্থাকে তলানিতে নিয়ে গেছে। তাই সংস্কারের মূল স্লোগান হওয়া উচিত গভর্ন্যান্স ফার্স্ট বা শাসনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই ব্যাংকের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের জন্য সঠিক ফিট অ্যান্ড প্রপার পরীক্ষার বাস্তবসম্মত নীতিমালা গ্রহণ ও কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। ঋণের প্রকৃত মালিকানা বা বেনিফিশিয়াল ওনারশিপের স্বচ্ছ ঘোষণার ব্যবস্থা করতে হবে, যার জন্য পরিষ্কার আইন প্রণয়ন জরুরি। পরিচালকদের মেয়াদ, অন্য ব্যাংকে বিনিয়োগের সীমা এবং স্বতন্ত্র পরিচালক বিষয়ক নিয়মগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনকে ব্যাসেলের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, যেখানে বাস্তব পরিস্থিতিভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

দ্বিতীয় স্তম্ভ: মূলধন সংকট ও ব্যাংক রেজোল্যুশন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে, যা গোপন দেউলিয়াত্বের সমস্যা তৈরি করেছে। এর ফলে বারবার পুনঃমূলধন জোগানের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত একটি নিরপেক্ষ সম্পদ মান পর্যালোচনা সম্পন্ন করা এবং সময়সীমা ঠিক করে পুনঃমূলধন জোগানের পরিকল্পনা করা।

তবে এই ব্যবস্থা কেবল সেই সব ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য করা উচিত, যারা ঋণ অবলোপন, সুশাসনকেন্দ্রিক সংস্কার এবং মন্দ ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেওয়া ব্যাংক পুনর্গঠনের শর্ত মেনে নিতে রাজি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রক্রিয়া তদারকি করবে। যারা এসব শর্তে রাজি হতে অপারগ, তাদের জন্য ব্রিজ ব্যাংক তৈরি, পারচেজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশন পরিকাঠামো বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের মতো ব্যাংক রেজোল্যুশন টুলকিট ব্যবহার করতে হবে।

তৃতীয় স্তম্ভ: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আমূল সংস্কার

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজস্ব অপচয় বন্ধ করতে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এই ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ও শাসনকাঠামোয় আমূল সংস্কার অপরিহার্য। এই একীভূতকরণ তখনই কার্যকর হবে, যখন জবাবদিহি, পেশাদার পর্ষদ গঠন এবং ঋণ আদায়ের কঠোর নির্দেশনাকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করা যাবে।

চতুর্থ স্তম্ভ: মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার সমন্বয়

দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত এলোমেলো সংকেত, যেমন সুদের হারের করিডর ইচ্ছেমতো বদলানো, আমাদের নীতির ওপর বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি। নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত তাড়নাকে উল্টোপথে নেওয়া এবং এবিবির সঙ্গে ইগো-বিহীন যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংককে মূল্যস্ফীতির একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুসরণ করতে হবে এবং পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করতে হবে। সুদহারের করিডরই যেন আমানত ও ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো চাপে এটি প্রভাবিত না হয়।

আইনের প্রয়োগ ও আস্থা পুনরুদ্ধার

দ্রুততর সময়ে মন্দ ঋণ আদায়ের আদালত-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা, ক্রেডিট ব্যুরো তৈরি, অর্থ পাচারবিরোধী আইনের প্রয়োগ এবং ব্যাংকের স্বাস্থ্য প্রতিবেদন স্বচ্ছভাবে প্রকাশের মাধ্যমে ঋণবিষয়ক শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে। লক্ষ্য হলো হঠাৎ হঠাৎ জনগণকে বিস্মিত করা বন্ধ করা এবং একটি অনুমানযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিনিয়োগ আসে স্পষ্টতা থেকে, স্লোগান থেকে নয়।