পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশ সফরের সময় হোটেলভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য বর্তমানে বিদ্যমান হোটেলভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা (সিলিং) তুলে দিয়ে প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে খরচ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্বব্যাপী হোটেলভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান হার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্ত্রণালয়টি মনে করছে।
প্রস্তাবের পটভূমি
গত ৮ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রস্তাব পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে হোটেলভাড়া নির্ধারণ করলে এ খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে। প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছে তা প্রমাণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, ডলারসংকট ও ব্যয়সংকোচনের সময় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশ ভ্রমণে বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন পেলে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই মুহূর্তে হোটেলভাড়া বাড়ানোর পক্ষে নয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
বর্তমান হোটেলভাড়ার হার
সরকারি কাজে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বিদেশ ভ্রমণে গেলে প্রতিদিন হোটেলভাড়া বাবদ কত পাবেন, তা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বলা হয়, গ্রুপ-১–এ অন্তর্ভুক্ত দেশে গেলে একজন মন্ত্রী প্রতিদিন হোটেলভাড়া বাবদ পাবেন ৪২০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫১ হাজার ২৪০ টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা করে)। বর্তমানে মন্ত্রীরা বিদেশ সফরে প্রতিদিন হোটেলভাড়া বাবদ পান সর্বোচ্চ ৪২০ ডলার। প্রতিমন্ত্রীরা পান সর্বোচ্চ ৩১২ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৮ হাজার ৬৪ টাকা। এ হোটেলভাড়া দেওয়া হয় ডলারে। ‘সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণকালে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রাপ্য ভ্রমণভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা’সংক্রান্ত ওই আদেশে জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদেরও হোটেলভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
গ্রুপ-১ দেশের তালিকা
গ্রুপ-১–এর মধ্যে ৩০টি দেশের নাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, স্পেন ও তুরস্ক। এ ছাড়া রয়েছে ইউরোপ, ওশেনিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশ।
পররাষ্ট্র সচিবের চিঠি
অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারকে দেওয়া চিঠিতে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গ্রুপ-১–এ অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর হোটেলভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য বিদেশ ভ্রমণে হোটেলভাড়া নির্ধারিত। তবে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে অনেক আন্তর্জাতিক নগরীতে যখন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তখন বিদ্যমান হোটেলভাড়ার সীমার মধ্যে কূটনৈতিক প্রটোকল ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বজায় রেখে আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভবপর হচ্ছে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিতে বিভিন্ন বৈঠক, সম্মেলন ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের ভেন্যুর কাছাকাছি হোটেলে অবস্থান করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান ব্যয়ের সীমার কারণে অনেক সময় প্রতিনিধিদলকে অনুষ্ঠানস্থল থেকে দূরে থাকতে হয়, যা সময়, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের একটি উদাহরণ টেনে চিঠিতে সচিব উল্লেখ করেন, লন্ডন সফরে একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেলে সাধারণ একটি রুম দৈনিক ৮৫০ মার্কিন ডলার রেটে বুকিং করা হয়, যা নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণের চেয়ে বেশি ছিল। পরে বাড়তি টাকার বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি নেওয়া হয়।
চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক দেশেই মন্ত্রীপর্যায়ের ব্যক্তিদের হোটেলভাড়ার কোনো নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নেই। প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে তাঁদের হোটেলভাড়া পরিশোধ করা হয়। তিনি মনে করেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তখন কূটনৈতিক মর্যাদা, প্রটোকল এবং নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। তাই হোটেলভাড়ার সীমা বাস্তবতার আলোকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদ্যমান ঊর্ধ্বসীমা শিথিল করা জরুরি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের হোটেল ভাড়া বাড়াতে পররাষ্ট্রসচিব এমন এক সময়ে চিঠি দিলেন, যখন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য আকাশপথে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিজনেস শ্রেণির পরিবর্তে সুলভ শ্রেণি (ইকোনমি ক্লাস) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারের আর্থিক ব্যয় সংকোচনের জন্য গত ৩০ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, ডলারসংকট ও ব্যয়সংকোচনের সময় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশ ভ্রমণে বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন পেলে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে বলা হয়, সরকারের অতিরিক্ত সচিব, সমপর্যায়ের সরকারি, স্বশাসিত, সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণে আকাশপথে সুলভ শ্রেণিতে যাতায়াত করবেন। এত দিন এ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিজনেস শ্রেণি বা এক্সিকিউটিভ শ্রেণিতে ভ্রমণের সুযোগ পেতেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় ৯ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধা কমিয়ে গত ১৩ এপ্রিল পরিপত্র জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তাতে বলা হয়, সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া এবং সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকবে। প্রশিক্ষণ ব্যয় ব্যতীত অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। সভা ও সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। ভ্রমণ ব্যয় ৩০ শতাংশ কমাতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিতে বিভিন্ন বৈঠক, সম্মেলন ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের ভেন্যুর কাছাকাছি হোটেলে অবস্থান করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান ব্যয়ের সীমার কারণে অনেক সময় প্রতিনিধিদলকে অনুষ্ঠানস্থল থেকে দূরে থাকতে হয়, যা সময়, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বৈঠক ও কূটনৈতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর বড় শহরে নির্ধারিত ভাতার মধ্যে উপযুক্ত ও নিরাপদ হোটেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সরকারি বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে হোটেলভাড়ার বিদ্যমান সীমা অপসারণ করে প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে হোটেলভাড়া নির্ধারণের অনুরোধ করেন পররাষ্ট্রসচিব।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সরকারের আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ততটা ভালো নয়। সরকার ব্যয় কমাচ্ছে। এখন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের হোটেলভাড়া বাড়ানোর সময় নয়। তবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তবে প্রস্তাব অনুযায়ী বাড়ানো হবে।



