আফগানিস্তানের চালের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর হয়েছে ভারত। ইতিমধ্যে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের প্রায় ১১০ কোটি ডলারের রপ্তানি ক্ষতি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ২০০ কোটি ডলারের রপ্তানি কমেছে। খবর দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও দ্য হিন্দুর।
পাকিস্তানের রপ্তানি ক্ষতি ও ভারতের সুযোগ
গত শুক্রবার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের বাণিজ্যবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে এ তথ্য জানানো হয়। বৈঠকে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়।
পাকিস্তানের বাণিজ্যসচিব জাওয়াদ পল কমিটিকে জানান, খাদ্যপণ্যের রপ্তানি কমেছে ২৫ শতাংশ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের তুলনামূলক সস্তা চালের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় পাকিস্তানের চাল রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জাওয়াদ পল বলেন, “গুণগত মানের দিক থেকে পাকিস্তানের চাল এখনো ভালো। তবে ভারত কম দামে চাল বিক্রি করায় আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তান জায়গা হারাচ্ছে।”
দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পাকিস্তান
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কমিটিকে জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় চাল প্রতি টন প্রায় ১ হাজার ১০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। সেখানে পাকিস্তানের চালের দাম প্রায় ১ হাজার ৩০০ ডলার। ফলে দামের প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের চাল পিছিয়ে পড়ছে।
পাকিস্তানের ক্ষতিতে ভারতের লাভ হওয়ার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আফগান ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে চাল আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছেন।
ভারত-আফগানিস্তান বাণিজ্য আলোচনা
দ্য হিন্দুর সংবাদে বলা হয়েছে, বাসমতী চালের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ভারত ও আফগানিস্তানের ব্যবসায়ীরা বৈঠকে বসতে পারেন। গত সপ্তাহে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হওয়ার পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আফগানিস্তান মূলত পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করে। এত দিন ভৌগোলিক সুবিধার কারণে অভিন্ন স্থল সীমান্ত ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকেই চাল আমদানি করে আসছিল কাবুল। তবে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে আফগানিস্তান।
এর অংশ হিসেবে ভারত থেকে সরাসরি বাসমতী চাল আমদানির সম্ভাবনা বিবেচনা করছে আফগানিস্তান। সে কারণেই ব্যবসায়ীদের এই উদ্যোগ। আফগানিস্তানে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টন বাসমতী চালের চাহিদা রয়েছে।
সরাসরি আমদানির সম্ভাবনা
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নয়াদিল্লিতে আফগান কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা ভারতীয় বাসমতী চালের আমদানি বৃদ্ধির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে আফগানিস্তান দুবাই ও ইরানের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ভারতীয় বাসমতী চাল কিনে থাকে। কিন্তু এতে আমদানির ব্যয় বেড়ে যায়।
আফগান কর্মকর্তাদের ধারণা, ভারত থেকে সরাসরি চাল আমদানি করা হলে তা আরও সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য হবে। এ ক্ষেত্রে ইরানের বন্দর আব্বাস ব্যবহার করে চাল পাঠানোর প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। এ জন্য দুই সরকারের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা জানান, এ মাসের সম্ভাব্য বৈঠকে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকেরা পরিবহনব্যবস্থা, অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ও সম্ভাব্য পণ্যবিনিময়ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করবেন। ভারত আফগানিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ শুকনা ফল আমদানি করে। ফলে পণ্যবিনিময়ভিত্তিক বাণিজ্যের সুযোগ আছে।
ভারতের বাসমতী চাল রপ্তানির ইতিহাস
আফগানিস্তানে ভারতের বাসমতী চাল রপ্তানি বরাবরই সীমিত। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রথম আফগানিস্তানে চাল রপ্তানি করে ভারত। সেবার মাত্র ৬৩ টন বাসমতী চাল রপ্তানি করে তারা। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ২০১০-১১ অর্থবছরে আবার রপ্তানি শুরু হয়। এরপর চাল রপ্তানি হয়েছে, তবে তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়।
দ্য হিন্দুর তথ্যানুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরে আফগানিস্তানে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৪৪০ টন বাসমতী চাল রপ্তানি করে ভারত, যার মূল্য ছিল ১০৮ কোটি ৯০ লাখ রুপি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে রপ্তানি হয়েছে ৯৭৯ টন, যার মূল্য ৭ কোটি ৭৪ লাখ রুপি। প্রতি কেজির গড় রপ্তানিমূল্য প্রায় ৭৯ রুপি।
ভারত যখন বাসমতী চালের বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে, তখন এ উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আফগানিস্তানে প্রায় আট লাখ টন বাসমতী চাল রপ্তানি করে পাকিস্তান। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আফগানিস্তানে অবাসমতী চাল হিসেবে রপ্তানি হওয়া চালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সুগন্ধি চালের মিশ্রণ থাকে।



