চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতের রপ্তানিতে নগদ সহায়তা (ক্যাশ ইনসেনটিভ) বা প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে সরকার। গত অর্থবছরের মতো এবারও প্রণোদনার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পণ্যভেদে সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা পাবেন রফতানিকারকরা।
সার্কুলার জারি ও শর্তাবলি
রবিবার (৫ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনুমোদিত (অথরাইজড ডিলার) সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতের রফতানির বিপরীতে এই নগদ সহায়তা কার্যকর থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানি আয় দেশে প্রত্যাবাসন, বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধি-বিধান অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রণোদনা দেওয়া হবে।
এছাড়া নগদ সহায়তার আবেদন নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নিয়োজিত বহিঃনিরীক্ষক বা অডিট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষা সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে আবেদন যাচাই-বাছাই ও অর্থ পরিশোধে বিদ্যমান নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশীয় বস্ত্র ব্যবহার করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানিতে বিকল্প নগদ সহায়তা ১ দশমিক ৫০ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। ইউরো অঞ্চলে রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত ০ দশমিক ৫০ শতাংশ বিশেষ সহায়তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সহায়তাও অব্যাহত থাকবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে নতুন বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক খাতে বিশেষ নগদ সহায়তা হিসেবে ০ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে।
বৈচিত্র্যপূর্ণ পাটপণ্য ও চামড়াজাত পণ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে। পাটজাত চূড়ান্ত পণ্যে ৫ শতাংশ, পাট সুতা (ইয়ার্ন ও টোয়াইন) রফতানিতে ৩ শতাংশ এবং হস্তশিল্পে ৬ শতাংশ নগদ সহায়তা বহাল রয়েছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের বিভিন্ন পণ্য—যেমন কৃষিপণ্য, আলু, কাঁকড়া ও অন্যান্য মৎস্যজাত পণ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেওয়া হবে। এছাড়া জাহাজ রফতানিতে ৬ শতাংশ এবং পার্টিকেল বোর্ড রফতানিতে ৮ শতাংশ নগদ সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
আসবাবপত্র, প্লাস্টিক, কাগজ, সিরামিক, রেজর, মোটরসাইকেল, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি ও আইটিইএস), মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, সোলার ফটোভোল্টাইক মডিউল, কেবল এবং গ্যালভানাইজড স্টিল শিটসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সফটওয়্যার, আইটিইএস ও হার্ডওয়্যার রপ্তানিতে ৬ শতাংশ এবং ব্যক্তি পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় অর্জনের ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ সহায়তা বহাল রাখা হয়েছে।
বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক সুবিধা
সার্কুলারে বলা হয়েছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার বাইরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও হাইটেক পার্কে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোও শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত রফতানি সহায়তা পাবে।
নীতিগত ধারাবাহিকতায় গুরুত্ব
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত অর্থবছরের মতোই প্রণোদনার হার ও আওতা অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে রপ্তানি নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত রফতানিকারকদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণোদনার বিদ্যমান কাঠামো বহাল থাকায় প্রচলিত রফতানি খাতের পাশাপাশি অপ্রচলিত ও বহুমুখী রফতানি পণ্যের সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



