সার আমদানিতে প্রধান কেন্দ্র মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামের জটে আমদানিকারকদের পছন্দ বদল
ভৌগোলিক সুবিধা, উন্নত অবকাঠামো এবং দ্রুত পণ্য খালাসের সক্ষমতার কারণে আমদানিকৃত সার খালাসের ক্ষেত্রে এখন প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে মোংলা বন্দর। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত সারের প্রায় পুরোটাই এখন এই বন্দরে খালাস করা হচ্ছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় মোংলা বন্দর অধিকতর সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক হওয়ায় এই বন্দরটি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে সংকটের চিত্র
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বহুমুখী সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লাইটারেজ জাহাজের তীব্র অভাব এবং রাষ্ট্রীয় তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিজেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় খালাস কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মেরিন ডিলারদের পর্যাপ্ত তেল দিতে পারছে না।
বর্তমানে প্রায় ৯০টি মাদার ভেসেল বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় অলস বসে আছে। যেখানে পণ্য খালাসে ৩-৫ দিন লাগার কথা, সেখানে বর্তমানে এক থেকে দেড় মাস সময় লেগে যাচ্ছে। এছাড়া শ্রমিক ধর্মঘট ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ জটও চট্টগ্রাম বন্দর এড়িয়ে চলার অন্যতম কারণ।
মোংলা বন্দরের সুবিধা
মোংলা বন্দরটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত, যা সার আমদানির জন্য সুবিধাজনক। এছাড়া মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে এই বন্দরের আরও কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এগুলো হলো—
- নাব্য ও গভীরতা: পশুর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের ফলে বন্দরের নাব্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে বড় সারবাহী জাহাজগুলো অনায়াসেই জেটিতে ভিড়তে পারছে।
- পরিবহন সুবিধা: মোংলা থেকে নৌ, রেল ও সড়কপথে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন কৃষি প্রধান অঞ্চলে সার পৌঁছে দেওয়া সহজ ও সাশ্রয়ী। বিশেষ করে নওয়াপাড়া ঘাটের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নদীপথে সার পরিবহন আমদানিকারকদের জন্য বড় সুবিধা।
- গুদামজাতকরণ: বন্দর এলাকার আশপাশে পর্যাপ্ত সরকারি বাফার গুদাম বা ডিপো থাকায় সার খালাসের পর দ্রুত সংরক্ষণের নিশ্চয়তা মেলে।
- ডিজিটালাইজেশন: ২০২৫ সাল থেকে চালু হওয়া ডিজিটাল ভেসেল ট্র্যাকিং ও বুকিং সিস্টেম এবং নতুন ক্রেন স্থাপনের ফলে পণ্য হ্যান্ডলিং এখন অনেক বেশি আধুনিক।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সোনার বাংলা ট্রাক পরিবহন কোম্পানির মালিক মো. ফিরোজ মিয়া নান্নু জানান, "চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ জটের কারণে ট্রাক নিয়ে আমাদের অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হয়, যা লোকসানের কারণ। কিন্তু মোংলায় সেই অনিশ্চয়তা নেই। এছাড়া ঢাকা হয়ে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার পথে যে যানজট পোহাতে হয়, মোংলা রুটে সেই সমস্যা নেই।"
সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান জানান, "সার আমদানির দরপত্রেই অনেক সময় দ্রুত খালাসের স্বার্থে মোংলা বন্দরের বিষয়টি উল্লেখ থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরের জট এড়াতে জাহাজ মালিকরাও এখন মোংলায় পণ্য খালাসে বেশি আগ্রহী।"
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান স্বীকার করেছেন যে অতিরিক্ত চাপের কারণে চট্টগ্রামে জাহাজগুলোকে অপেক্ষায় থাকতে হয়, সেই তুলনায় মোংলা বন্দর এখন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় সেবা দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর মোংলা এখন আধুনিকায়ন ও মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বন্দরটি এখন বিশ্বমানের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মোংলা বন্দরে বর্তমানে বড় ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার জাহাজ অনায়াসেই নোঙর করতে পারছে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দর কর্তৃপক্ষ বার্ষিক ১ হাজার ৫০০টি বিদেশি জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া টিইইউএস কন্টেইনার, কয়েক মিলিয়ন টন কার্গো এবং বিপুল পরিমাণ রিকন্ডিশনড গাড়ি হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জনে কাজ চলছে।
বর্তমানে বন্দরে ৯ নম্বর জেটিসহ বেশ কয়েকটি জেটি পূর্ণ মাত্রায় সচল রয়েছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আরও নতুন ৬টি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বন্দরের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন শক্তিশালী ক্রেন স্থাপন করা হয়েছে এবং ২০২৫ সাল থেকে চালু হয়েছে ডিজিটাল ভেসেল ট্র্যাকিং ও বুকিং সিস্টেম, যা বন্দর ব্যবস্থাপনায় গতি এনেছে।
মোংলা বন্দরের প্রধান সমস্যা ‘পশুর চ্যানেলের’ নাব্য সংকট দূর করতে ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়মিত চলমান রয়েছে। চ্যানেলের গভীরতা বাড়ানোর এই উদ্যোগের ফলে এখন আগের চেয়ে অনেক বড় ও গভীর ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মোংলা বন্দর এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট গেটওয়েতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য এবং ভুটানের পণ্য পরিবহনে এই বন্দরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আরও বাড়াতে প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘চীন-বাংলাদেশ প্রকল্প’ নামে একটি মেগা প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কারণে মোংলা বন্দর এখন আমদানিকারকদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি আস্থাশীল হয়ে উঠেছে। ট্রানজিট সুবিধা এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের সাথে ভালো সংযোগ থাকায় আগামীতে এই বন্দর দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।



