মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: মাংস আমদানিতে ফরিদা আখতারের উদ্বেগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি তারিখে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের জন্য পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ শতাংশ, তবে এর সাথে যুক্ত হয়েছে নানা শর্তাবলি। শর্তগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র গবাদি পশু, মাছ এবং মাংসের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এই বিশেষ শর্তে বাধা দিয়েছিলেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একটি ফোনালাপে তিনি তার উদ্বেগের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত পণ্যের তালিকা
ইউএসটিআর-এর প্রকাশিত তফসিল-১-এ ইআইএফ শ্রেণিবদ্ধ পণ্যের সংখ্যা ১৫৫৫টি। এই তালিকায় জীবন্ত প্রাণির মধ্যে রয়েছে উন্নত জাতের পশু যেমন ঘোড়া, গাধা, শুকর, জীবন্ত ভেড়া, ছাগল, বিভিন্ন ধরনের হাঁস-মুরগি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ এবং পতঙ্গ। মাংস, মাছ ও ভোজ্য উপজাত পণ্যের মধ্যে শুকর, ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়ার টাটকা বা হিমায়িত মাংস, বিভিন্ন ধরনের পোল্ট্রি, লবণজাত পণ্য, শুকানো মাংস, ভোজ্য চর্বি বা নাড়িভুঁড়ি অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া অ্যাকোয়ারিয়ামের শোভাবর্ধক মাছ, টাটকা বা হিমায়িত মাছ যেমন ট্রাউট, স্যামন, হ্যালিবাট, টুনা, হেরিং, সার্ডিন, ম্যাকেরেল, কড এবং কাঁকড়া, চিংড়িও ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত।
দুগ্ধ ও প্রাণিজ পণ্যের মধ্যে দই, ঘোল, বিভিন্ন ধরনের পনির, নিষিক্ত ও সাধারণ ডিম, পশুর লোম, হাড় এবং ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু প্রাণিজ উপাদান রয়েছে। শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে নির্দিষ্ট জাতের আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য ডালজাতীয় শস্য অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাদাম যেমন চেস্টনাট, পাইন নাট এবং ফল যেমন শুকনো খেজুর, ডুমুর, আনারস, অ্যাভোকাডো, পেয়ারা, আম, লেবুজাতীয় ফল, তরমুজ, নাশপাতি, চেরি, পিচ ও স্ট্রবেরি ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত।
ফরিদা আখতারের বাধা ও উদ্বেগ
ফরিদা আখতার বলেন, "আমরা মন্ত্রণালয় থেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমি যেহেতু প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম, ফলে ওই চুক্তিতে যেসব পণ্য আমাদেরকে আনতেই হবে, তার মধ্যে মাংসসহ অনেকগুলো দুগ্ধজাত পণ্য ছিল। যে কারণে আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কয়েকবার আলোচনা করেছে। অনেকে যেটা মনে করেন—নির্বাচনে মাত্র তিনদিন আগে এই চুক্তিটা হয়ে গেছে, আসলে তা না। আমরা নিজেরাই আসলে এর আগে এটাকে ডিসক্লোজ করিনি। আমাদের প্রতিনিধিদল তো ওয়াশিংটনে গিয়েছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যাবার আগে ওরা সংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা বাধা দিয়েছিলাম, আমাদের এখানে যেসব পণ্য প্রস্তুত হয় সেগুলোর জন্য। অন্য যেসব একটু এলিট পণ্য যেমন- চিজ, এগুলোর ব্যাপারে আমরা কিছু বলিনি। কিন্তু মাংসের ব্যাপারে যেহেতু আমাদের একেবারে প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষ জড়িত গরু-ছাগল পালনের সঙ্গে, অর্থাৎ আমাদের মাংস উৎপাদনের সঙ্গে যে খামারিরা আছেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ আমেরিকান মাংস যদি ৩০০ টাকায় আসে, আর আমার এখানে ৬০০-৭৫০ টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে তো অবশ্যই মার্কেটে একটা ইমব্যালেন্স তৈরি হবে। তাতে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটা ছিল আমাদের একটা পয়েন্ট।"
দ্বিতীয় পয়েন্ট হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, "দুই নম্বর পয়েন্ট ছিল, আমদানিকৃত মাংসগুলোতে জুনোটিক রোগ বা এগুলো হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা, সেটা কিন্তু আমরা জানি না। ফলে এই সম্ভাবনাতে আমরা একটু আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। কারণ ২০১৯ সালের আগে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগটা কিন্তু গরুতে ছিল না। লাইভস্টক ডিপার্টমেন্টের অনেকেই বলেন যে, আমদানির মাধ্যমে অনেক রোগ পোল্ট্রিতে আসে। যেমন- আমেরিকার কোন অঞ্চল থেকে পোল্ট্রি আনছে, সেটার ওপর নির্ভর করবে আপনার এভিএন ফ্লু বা এ ধরনের রোগ ছড়াবে কিনা। এগুলোতে আমাদের অনেক কনসার্ন আছে। ফলে আমরা বলছি, এগুলো আমরা মনে করি ঝুঁকিপূর্ণ। আর খামারিদের প্রশ্ন তো আছেই। আরেকটা হলো, এখানে ধরুন, মাংসটা আনলো। কিন্তু মাংস তো পোর্ট থেকে সরাসরি বাজারে যাবে না। এর মধ্যেও এটা আনসেফ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।"
টেস্টিং ক্যাপাসিটি ও জেনেটিক মোডিফিকেশনের প্রশ্ন
সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, "ওরা যদি ওখান (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে টেস্ট করেও বলে যে— এটা ঠিক আছে, সেটা সবচেয়ে বেশি অসুবিধা লেগেছে আমার। সেটা হলো, ওদের টেস্টটাকেই মেনে নিতে হবে। আমাদের এখানে নাকি কোনও টেস্ট করানো যাবে না।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, "আমাদের সেই টেস্টিং ক্যাপাসিটি আছে, কিংবা যদি না থাকে— তাহলে না থাকা অবস্থায় আনবো কেন? কিন্তু আমাদের সেটা আছে। আরও যেটা আমি একদম পরিষ্কার বলতে চাই, ইউএস লাইভস্টক প্রোডাকশন বেসিক্যালি ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইভস্টক প্রোডাকশন। ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইভস্টকটা হচ্ছে— পুরোটাই জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড। আমাদের মতো গরুকে ঘাস খাইয়ে ওরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন করছে না। ফলে তারা যতই বলুক, তারা টেস্ট করছে কিছু পায়নি বা করেনি।"
ফরিদা আখতার বলেন, "জিএম ফুড বা জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড সয়াবিন এবং জেনেটিক্যালি মোডিফাইড কর্ন ইউএসএ উৎপাদন করে। লাইভস্টক ফিড হিসেবে অথবা অয়েলটা বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে আসে। মূলত ওরা লাইভস্টক ফিডের জন্যই করে। সেই প্রেক্ষিতেই আমার উদ্বেগ ছিল।"
ফিডব্যাক ও চুক্তির প্রকৃতি
উদ্বেগের বিষয়ে জানানোর কোনও ফিডব্যাক পেয়েছিলেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, "ওয়াশিংটন থেকে ফিরে এসে বলছে, 'শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে না, অন্যান্য দেশের সঙ্গে ট্রাম্প সরকার এটা করছে।' এটা তো ওয়ান সাইডেড, মানে এখানে তো আপনাদেরকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছে না। যেমন- তুলা যেটা আনবে, তুলাটা আমাদের জন্য আসলে দরকার আছে কিনা, এটা কিন্তু আমাদেরকে নিতেই হবে। যেহেতু আমাদেরকে ওই দেশে গার্মেন্ট এক্সপোর্ট করতে হবে। এটা তো অনেকটা আমাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে। তা আমি অন্তত চাইছিলাম যে, এই মাংস বা যেগুলো আমাদের একেবারে সরাসরি খামারিদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, ওই জায়গাগুলোতে কিছু পরিবর্তন করানো যায় কিনা। কিন্তু আমাদেরকে বলা হলো— এটা আসলে এখানে কোনও সুযোগ ছিলনা। মানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা ওদেরও কোনও সুযোগ ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। চুক্তিটি এমনই।"
