টেকনাফ স্থলবন্দর: এক বছর ধরে অচল, বাণিজ্য বন্ধে সংকট তীব্র
মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় টেকনাফ স্থলবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। গত এক বছর ধরে এই বন্দর দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে গত বছরের ৩ মার্চ থেকে এই বন্দর বন্ধ রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জীবিকার সংকট
এই বাণিজ্য বন্ধের ফলে দেড় শতাধিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও সিত্তে বন্দরে আটকে আছে। পণ্যগুলোর মধ্যে কাঠ, সুপারি, বরই, তেঁতুল, হিমায়িত মাছ ও শুঁটকি রয়েছে। দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকার কারণে শত কোটি টাকার পেঁয়াজ ও আদা ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
একই সঙ্গে সরকার মাসে প্রায় ১২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। শুল্ক বিভাগের এক কর্মকর্তার মতে, বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা এক বছরে দেড় হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক প্রায় ৪০০ আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা সংকটে পড়েছে।
শ্রমিকদের দুর্দশা ও বন্দরের ফাঁকা দৃশ্য
গত বুধবার সরেজমিনে দেখা গেছে, দক্ষিণের একমাত্র এই স্থলবন্দরটি প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। বন্দরে নেই কোনো পণ্য, নেই শ্রমিকের কোলাহল কিংবা ট্রাকের সারি। নাফ নদীর তীরের জেটিতেও পণ্যবোঝাই ট্রলার বা জাহাজের দেখা মিলছে না। বন্দরের বাইরের সড়কের দোকানপাটও অধিকাংশ বন্ধ।
শ্রমিক নুর কামাল (৪২) বলেন, "আগে প্রতিদিন মাল খালাস করে প্রায় ৭০০ টাকা আয় হতো। সেই আয়েই পাঁচ সদস্যের সংসার চলত। এক বছর ধরে কাজ না থাকায় দুই ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।" বন্দরে আগে দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, যাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ এখন বেকার বলে জানান শ্রমিকদের দলপতি শামসুল আলম।
চোরাচালানের বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সীমান্তে চোরাচালান থেমে নেই। সীমান্ত সূত্র জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অন্তত ৩৩টি স্থান দিয়ে নিয়মিত পণ্য পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সার, জ্বালানি, সিমেন্ট ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য মিয়ানমারে যাচ্ছে, বিপরীতে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা, আইস ও অস্ত্রের চালান।
বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত দেড় মাসে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৪৫টি অভিযান চালিয়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে। টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হানিফুর রহমান বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার ঠেকাতে বিজিবি দিনরাত কাজ করছে এবং ড্রোন, থার্মাল ইমেজার, রাডারসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বাণিজ্য চালুর প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক মন্তব্য
সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান বন্ধ এবং টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কারণে এত দিন বাণিজ্য বন্ধ ছিল, এখন এটি চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, সীমান্ত চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য চালু করা প্রয়োজন, যার জন্য মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও সমন্বয় জরুরি।
কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী মন্তব্য করেন, "সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ করতে তৎকালীন বিএনপি সরকার টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করেছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থলবন্দর অচল করতে চোরাইপথে মাদকসহ বিভিন্ন মালামাল আনা হয়েছিল। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়, চোরাচালান বন্ধ করতে অচল সীমান্ত বাণিজ্য চালুর চেষ্টা চলছে।"
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়েছিল চোরাচালান নিরুৎসাহিত করতে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, দ্রুত সমাধান মিললে এই অঞ্চলের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
