পাঁচ দিন পর উৎপাদনে ফিরেছে ভারতীয় কোম্পানি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিট। ২২ এপ্রিল ভোররাতে কারিগরি ত্রুটির কারণে এটির উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেলে দেশে বেড়ে যায় লোডশেডিং। আজ সোমবার রাতে এটি চালুর পর আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে।
বন্ধের কারণ ও মেরামত
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও আদানির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এপ্রিলে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে গেলে আদানির কেন্দ্র থেকে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল। গত বুধবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা হয়। মেরামতের পর আজ সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ৪১ মিনিটে এটি আবার চালু করা হয়েছে। ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।
বকেয়া বিল নিয়ে সতর্কতা
বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দ্রুত পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে আদানি কোম্পানির সতর্কতা। কয়লার দাম নিয়ে পিডিবি ও আদানির মধ্যে বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে পিডিবি। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে এখানে। পিডিবি সূত্র বলছে, একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। ঘাটতি মেটাতে বাড়তি লোডশেডিং করতে হয়েছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম আজ রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আদানির বন্ধ থাকা ইউনিট চালু হয়েছে। এখন দুটি ইউনিট থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে।
আদানির চিঠি
এর আগে বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধের তাগাদা দিয়ে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে ভারতীয় কোম্পানি আদানি। বকেয়া শোধ না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানানো হয় চিঠিতে। ১৭ এপ্রিল স্বাক্ষরিত চিঠিটি ১৯ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় আদানি।
আদানির চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, বিল পরিশোধে দেরির কারণে প্রকল্পের অর্থপ্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি কিনে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। তাই সময়মতো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করলে আংশিক বা পুরোপুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকি থেকে যায়।
কয়লার দাম বিরোধ
বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার দাম নিয়ে পিডিবির সঙ্গে আদানির বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। আদানি কয়লার বাড়তি দাম ধরে বিল করছে। আর পিডিবি বাজার দামে বিল পরিশোধ করছে। দেশের উচ্চ আদালতে আদানির চুক্তির বিরুদ্ধে একটি রিট মামলা চলমান। এরই মধ্যে আদালতের আদেশে আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করে গত জানুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানির সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও চুক্তির প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি–অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়োগ করা আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা কাজ করছেন।
আদানির দাবি
আদানির চিঠিতে বলা হয়, তাদের মোট পাওনা ৬৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার (১২২ টাকা দরে যা ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা) নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, যা ৪ থেকে ৫ মাসের বিলের সমান। এরপরও বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই দ্রুত পুরো বকেয়া শোধ করতে এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত বিল পরিশোধের অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্বকে তাঁরা গুরুত্ব দেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে মন্ত্রীর সুবিধামতো সময়ে সাক্ষাৎ করে আলোচনার জন্য সময় চাওয়া হয়েছে চিঠিতে।
সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
চুক্তি অনুসারে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ। পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি। এর মধ্যে গ্যাসস্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন তালিকার বাইরে আছে।
বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১৭টি সৌর, যা থেকে রাতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। ডিজেলচালিত ৫টি কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয় খরচ বেশি হওয়ায়। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস–সংকটের কারণে সেখান থেকে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
গরমের শুরুতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও সব মিলিয়ে উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।



