ঢাকায় বাস কম, ব্যক্তিগত গাড়ি বেড়েছে, যানজট প্রকট
ঢাকায় বাস কম, ব্যক্তিগত গাড়ি বেড়েছে, যানজট প্রকট

যানজট নিয়ন্ত্রণে ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ঢাকায় ছোট যান বাড়ছে। সে তুলনায় বাস বাড়ছে না। ১৯ এপ্রিল কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে ছবি: তানভীর আহাম্মেদ। ঢাকায় গত দেড় দশকে বাস কম হারে বেড়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে গাড়ি বা সেডান কার, স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি, যা জিপ নামে পরিচিত), মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল। অটোরিকশা বেড়েছে, তবে তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম।

সরকারের নীতি গাড়ি কেনায় উৎসাহ দিয়েছে। এ কারণে বেড়েছে যানজট। সেই যানজট নিরসনের নামে ঢাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু দেখা যায়, বিপুল ব্যয়ের সেই উড়ালসড়কগুলোর ওপরই এখন যানজট হচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত বাস, মিনিবাস, গাড়ি (সেডান কার), এসইউভি, মাইক্রোবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬২ হাজার ৭৮৫। এর মধ্যে ৫ শতাংশ ছিল বাস ও মিনিবাস। ২০২৫ সালে এই সাত ধরনের যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ লাখ ২১ হাজার ৩৮৭-এ। এর মধ্যে বাস ও মিনিবাস ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঢাকায় নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের একটি বড় অংশ দূরপাল্লায় ও ঢাকা থেকে আশপাশের জেলায় চলাচল করে। শহরের ভেতরে স্বল্প দূরত্বে চলাচল করে মূলত মিনিবাস। ২০১০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মিনিবাসের সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৩৪১-এ দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে গাড়ি ও এসইউভি বেড়েছে ১৫২ শতাংশ।

সড়কে গত কয়েক বছরে লাফিয়ে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। যাত্রী অধিকার সংগঠন, পুলিশ ও অন্যান্য অংশীজনের হিসাবে, ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত তিন চাকার অবৈধ রিকশার সংখ্যা ১৫ লাখের মতো। ছোট যানবাহনের কারণে সড়কে দুর্ঘটনাও বেড়ে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিগত সরকারগুলো ঢাকায় গাড়ি কেনাকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছে। বাস নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নানা বাধা তৈরি করে রাখা হয়েছে। ফলে বাসের সংখ্যা সেভাবে বাড়েনি। তিনি বলেন, নগরের ৫৩ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে বাস। ব্যবহার করে রাস্তার ১৫ শতাংশের মতো। অন্যদিকে গাড়িতে চলাচল করেন ৯ শতাংশ মানুষ। কিন্তু রাস্তার প্রায় ৭০ শতাংশ দখলে থাকে গাড়ির।

বাসের বদলে বড় প্রকল্পে জোর

২০০৫ সালে ঢাকার জন্য করা ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) অনুমোদন করে সরকার। এর বাস্তবায়নের সময়সীমা ধরা হয় ২০২৫ সাল পর্যন্ত। এ পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, শহরের বেশির ভাগ মানুষ চলাচলের জন্য বাসের ওপর নির্ভরশীল। তাই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাসকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ওই পরিকল্পনায় বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন, বাসগুলো রুটভিত্তিক একক কোম্পানির অধীন নিয়ে আসা, ছোট বাসের জায়গায় আরামদায়ক বড় বাস নামানো ইত্যাদির কথা বলা হয়েছিল।

জাইকা ২০১৫ সালে সংশোধিত এসটিপি প্রণয়ন করে। এতে বলা হয়, ঢাকার মানুষের ৮০ শতাংশ যাতায়াত হয় গণপরিবহনে। বাকি ২০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্যান্য মাধ্যমে হয়। গণপরিবহন যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁদের প্রায় ৬৪ শতাংশ বাস-মিনিবাস ব্যবহার করেন। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল, বেশ কিছু উড়ালসড়ক ও বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) তৈরি হওয়ার কথা। এরপরও ২০৩৫ সাল নাগাদ ৫৭ শতাংশ যাতায়াত বাস-মিনিবাসনির্ভর হবে।

সরকারগুলো বাসের ওপর জোর কম দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক উড়ালসড়ক। মেট্রোরেলও নির্মাণ করা হয়েছে এবং তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে; যদিও সুফল শুধু একটি রুটে সীমাবদ্ধ।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকাকে যানজটমুক্ত করার নামে সরকার পদচারী-সেতু, উড়ালসড়ক, বিআরটিসহ (বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট) নানা প্রকল্পে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। মেট্রোরেলে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার মতো। কিন্তু ঢাকার বেশির ভাগ মানুষের চলাচলের বাহন বাসের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বাস কেন কম

ঢাকায় যাত্রীবাহী বাস-মিনিবাস চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট) দেয় মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (মেট্রো আরটিসি)। এর প্রধান পদাধিকারবলে পুলিশ কমিশনার। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশসহ সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়াও পরিবহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কমিটির সদস্য।

২০১৮ সালে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত নেয়, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা (বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন) প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ঢাকায় নতুন করে বাসের রুট পারমিট দেওয়া হবে। এরপর ২০১৯ সাল থেকে মেট্রো আরটিসিকে নতুন করে বাসের রুট পারমিট না দেওয়ার নির্দেশনা দেন তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।

রুট র‍্যাশনালাইজেশনের আওতায় এরপর কয়েকটি পথে বাস নামানো হয়। তবে এ ব্যবস্থা এখন আর কার্যকর নেই। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মেট্রো আরটিসি কার্যকর করা হয়। এর পর থেকে আড়াই হাজারের বেশি বাসের রুট পারমিট দেওয়া হয়। তবে বিআরটিএ সূত্র বলছে, নতুন রুট পারমিট পাওয়া বাসের প্রায় সবই পুরোনো। কারণ, আরটিসিতে বছর বছর পারমিট নবায়ন করতে হয়। আরটিসি অকার্যকর থাকায় ঢাকার প্রায় সব বাসের রুট পারমিট মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অর্থাৎ ২০১৯ সালের পর ঢাকায় সেই অর্থে নতুন বাস নামেনি।

পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন বাস না নামার আরেকটি কারণ বলছেন। সেটি হলো, পুরোনো বাস উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে ২০১৫ সাল থেকে। মালিকদের স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু তা আর হয়নি। অন্যদিকে পুরোনো বাসের মালিকদের দাপটে নতুন বাসে বিনিয়োগে আগ্রহ কম ছিল। অন্যদিকে গত এক দশকে চীন ও ভারত থেকে বেশ কিছু নিম্নমানের বাস এসেছে। এর মধ্যে সিএনজিচালিত বাসগুলো কয়েক বছরের মধ্যেই অকেজো হয়ে গেছে, যা আসলে সড়কে নেই।

উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঢাকায় সড়ক খাতে বড় বড় প্রকল্প নেওয়ার মতো টাকা সরকারের হাতে নেই। অর্থনীতির গতি কমে গেছে, রাজস্ব আদায় কম। এখন সরকার বাস ব্যবস্থাপনায় নজর নিয়ে মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করতে পারে। সে জন্য দরকার উদ্যোগ এবং কোনো গোষ্ঠীর চাপে নত না হওয়া।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাইদুর রহমান বলেন, ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা জনবান্ধব নয়। নতুন সরকারকে সেটা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে সে বিষয়ে উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।