লন্ডনের বিখ্যাত উইম্বলডন টেনিস মাঠ পাহারা দেয় রুফাস নামের একটি বাজপাখি। এটি কিন্তু সাধারণ পাখি নয়; ‘হ্যারিস’ প্রজাতির এক শিকারি বাজপাখি রুফাস। অল ইংল্যান্ড ক্লাবের মাঠে যেন পায়রার ঝাঁক এসে ঘাস নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য রুফাসকে বিশেষভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করতে করতে রুফাস এখন উইম্বলডনের এক সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছে। উইম্বলডন টুর্নামেন্টের প্রতিদিনের চেনা নিয়মের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে রুফাস।
রুফাসের পরিচয় ও কাজের পরিধি
রুফাস আসলে একটি পুরুষ হ্যারিস বাজপাখি। অ্যাভিয়ান এনভায়রনমেন্টাল ইউকে নামের একটি সংস্থার ওয়েন ডেভিস নামের একজন ব্যক্তি রুফাসের ট্রেনার ও বন্ধু। রুফাস মূলত অল ইংল্যান্ড লন টেনিস ক্লাবের হয়ে ডিউটি করে। তবে এটি বেশ পরিচিত চাকরিজীবী। টেনিস কোর্ট ছাড়াও লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে ও কুইন এলিজাবেথ অলিম্পিক পার্কের মতো বড় বড় জায়গাতেও রুফাস অন্যান্য পাখি তাড়ানোর কাজ করে।
ওর কাজটা শুনতে সহজ মনে হলেও আসলে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। উইম্বলডনের সুন্দর মাঠটাকে পায়রার ঝাঁক যেন ফ্রিতে পিকনিক করার জায়গা বানিয়ে না ফেলে, সেটা দেখাই রুফাসের কাজ।
কেন রুফাসের উপস্থিতি জরুরি
যদি রুফাস আকাশে টহল না দিত, তবে পায়রাদের কিচিরমিচিরে উইম্বলডনের শান্ত পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যেত। আর মাঠে পায়রা ওড়াউড়ি করলে টেনিস খেলোয়াড়দের মনোযোগ নষ্ট হয়, যা ম্যাচের ফলাফলেও গন্ডগোল পাকিয়ে দিতে পারে।
রুফাস পুরো মাঠের পাহারাদার। প্রতিদিন সকালের আসল টেনিস ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই ও কোর্টের ওপর দিয়ে ডানা মেলে চক্কর দেয়। যেন পায়রাগুলো তাকে দেখে ভয় পেয়ে দূরে পালায়। উইম্বলডন টুর্নামেন্টে একে শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য রাখা হয় না। ওর আসল কাজ হলো স্টেডিয়ামের ছাদ, গ্যালারির বসার সিট আর খেলার মূল মাঠ থেকে পায়রাদের তাড়ানো।
রুফাসের দায়িত্ব ও ব্যস্ততা
উইম্বলডনে সারা বছর ধরেই পাখিদের দূরে রাখার একটা বড় প্রজেক্ট চলে। আর রুফাস হলো সেই দলের প্রধান। তবে যখন মূল চ্যাম্পিয়নশিপ বা টুর্নামেন্ট চলে, তখন রুফাসের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। তখন ওকে একটু পর পরই আকাশে ওড়ানো হয়। কোনো রকম খাঁচা বা ফাঁদ ছাড়াই, রুফাস শুধু ওর উপস্থিতি দিয়েই পাখিদের মাঠ থেকে দূরে রাখে।
রুফাস ২০০৮ সালে যখন প্রথম উইম্বলডন মাঠে টহল দেওয়া শুরু করে। তখন ওর বয়স ছিল মাত্র ১৬ সপ্তাহ। সেই হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই বিখ্যাত মাঠ পাহারা দিয়ে আসছে। অবশ্য উইম্বলডন ক্লাবে বাজপাখি দিয়ে পাখি নিয়ন্ত্রণের এই কাজ আরও আগে ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু হয়েছিল। তখন রুফাসের ট্রেনার ওয়েন ডেভিস প্রথম বাজপাখি নিয়ে উইম্বলডনের পায়রা সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে এসেছিলেন।
রুফাসের জনপ্রিয়তা ও বিশেষ ঘটনা
একটা সাধারণ পাখি তাড়ানোর কাজকে রুফাস উইম্বলডন টুর্নামেন্টের অন্যতম চেনা ও মজার এক ঐতিহ্যে বদলে দিয়েছে। আর এ কারণেই সে এত বিখ্যাত। পত্রিকার পাতায় বা টিভিতে তাকে ব্রিটেনের অন্যতম জনপ্রিয় পাখি বলা হয়। খেলা দেখতে আসা দর্শক থেকে শুরু করে বড় বড় টেনিস তারকাও রুফাসকে উইম্বলডনেরই একজন স্পেশাল মেম্বার মনে করেন।
২০১২ সালে রুফাসকে নিয়ে পুরো ব্রিটেনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। সে বছর আচমকা ওর মালিকের গাড়ি থেকে রুফাস চুরি হয়ে যায়। এই ঘটনায় গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। ভাগ্যবশত, তিন দিন পর উইম্বলডন কমন নামের একটি জায়গা থেকে ওকে সুস্থ অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। কেবল ওর একটি পায়ে সামান্য আঘাত লেগেছিল। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া ও জনসমক্ষে হাজির হয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় টুর্নামেন্টের এই পাখিটি দারুণ খ্যাতি পেয়েছে।
উইম্বলডনের কেন রুফাসকে এত প্রয়োজন
উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টের ছাদ, গ্যালারির আসন আর মাঠের নরম ঘাসের বীজ পায়রাদের খুব আকর্ষণ করে। সেখানে কোনো পাহারাদার না থাকলে পায়রার দল ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উড়ে এসে বড়সড় ঝামেলা পাকিয়ে দিতে পারে। এতে টেনিস খেলোয়াড়দের মনোযোগ সামান্য ভেস্তে গেলেই প্রিয় কোনো তারকা উইম্বলডন ট্রফিটি হারিয়ে বসতে পারেন।
অন্যান্য মাঠের চেয়ে উইম্বলডনের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, এখানকার খেলা হয় একদম নিখুঁত সবুজ ঘাসের ওপর। তাই মাঠের কোনো ক্ষতি না করে ক্ষতিকর পাখিদের তাড়াতে রুফাস এক দারুণ সমাধান। কোনো রকম বিষ বা খাঁচার ফাঁদ না পেতে, প্রকৃতিকে ভালো রেখেই মাঠ সুন্দর রাখার এক চমৎকার উপায় এনে দিয়েছে এই বাজপাখি।
সূত্র: ইয়াহু স্পোর্টস, উইলিয়াম হিল নিউজ



